করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণে দুর্গত মানুষের কল্যাণে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি করোনা সুরক্ষাসামগ্রীও বিতরণ করে আসছে ক্ষমতাসীন দলটি। অন্যদিকে, গত বছরের তুলনায় এবার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে তেমন সক্রিয় নেই বিএনপি। তবে চিকিৎসাসেবা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে তৎপর রয়েছে সরকারবিরোধী প্রধান এই রাজনৈতিক দলটি।
দেশের প্রধান এ দুই দলের বাইরে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা তেমন নেই। করোনার শুরুর দিকে কিছুটা সক্রিয় থাকলেও এখন প্রায় নিষ্ফ্ক্রিয় বিভিন্ন দল। সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভূমিকাও প্রায় নিষ্ফ্ক্রিয়। এই সংকটে মাঝেমধ্যে কিছু ত্রাণ অথবা করোনা সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা ছাড়া বামপন্থি দলগুলোর তৎপরতা নেই বললেই চলে। আবার বিভিন্ন দল ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা করোনার শুরুতে ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ ও সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে মাঠে ব্যাপক সক্রিয় থাকলেও এখন তাদের এ তৎপরতা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষত, গত এপ্রিল থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর ভয়াবহ আকার ধারণ করার পরও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকে তেমন সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। মানবিক সহায়তা কর্মসূচি থেকে নিজেদের গুটিয়েও নিয়েছেন অনেক নেতা। তারা বলছেন, গত এক বছরের বেশি সময় করোনার প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দায় তাদের আর্থিক সামর্থ্যও অনেকটাই কমে এসেছে। তাই তারা আগের মতো কার্যক্রম চালাতে পারছেন না।
দুই কোটি পরিবারকে সহায়তা আওয়ামী লীগের :গত বছরের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকেই কর্মহীন, দুস্থ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তৎপর হয়েছিলেন সর্বস্তরের নেতাকর্মী এবং মন্ত্রী-এমপি, দলের কেন্দ্রীয় নেতা, দলীয় মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলররা। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পাড়া-মহল্লায় স্থানীয় নেতাদের সর্বাত্মক ত্রাণ কার্যক্রম ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ও ছিল চোখে পড়ার মতো।
চলতি বছরের এপ্রিলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও নতুন করে লকডাউন শুরুর পরও দলীয়ভাবে ত্রাণ ও সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী লীগ। দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির ব্যানারে সারাদেশের অসহায় ও কর্মহীন মানুষকে খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। গত দেড় বছরে দেশের আটটি বিভাগ মিলিয়ে করোনাদুর্গত দুই কোটির বেশি পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। এই সময়ে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে ১৫ কোটি টাকারও বেশি।
সেইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠান ও মানুষের কাছে পিপিই, চশমা, মাস্ক, সাবান, হ্যান্ড গ্লাভস, ফিনাইল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ব্লিচিং পাউডার, স্প্রে মেশিনসহ করোনা সুরক্ষাসামগ্রী এবং হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে। মোবাইল ফোনে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা প্রদানে একশরও বেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন এলাকায় ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসও অব্যাহত রয়েছে। দলের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক উপকমিটির তত্ত্বাবধানে এই টেলিমেডিসিন ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ করোনাসহ অন্য রোগীদের চিকিৎসায় টেলিমেডিসিন সার্ভিস, 'ডক্টরস সেফটি চেম্বার' স্থাপন, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং মৃত ব্যক্তির দাফন অথবা সৎকার ছাড়াও কৃষকের ধান কেটে দেওয়ার কার্যক্রম চালিয়েছে। যদিও প্রথম পর্যায়ের তুলনায় দ্বিতীয় পর্যায়ে এই তৎপরতায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে।
সর্বশেষ গত ঈদুল ফিতরের আগে করোনাদুর্গত মানুষের মধ্যে 'প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার' বিতরণের পর গত তিন মাসে বড় ধরনের কোনো ত্রাণ কার্যক্রম চোখে পড়েনি অধিকাংশ সহযোগী সংগঠনের। তবে যুবলীগ সম্প্রতি রাজধানীসহ সারাদেশে দুস্থ মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ এবং রেশনিংয়ের আদলে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কার্যক্রম শুরু করেছে। ৬০ লক্ষাধিক মানুষকে এই খাদ্য সহায়তা দেওয়া ছাড়াও বিনামূল্যে অক্সিজেন, অ্যাম্বুলেন্স ও টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ ও করোনায় মৃতদের দাফনকর্মে অংশ নিচ্ছেন যুবলীগ নেতাকর্মীরা। শিগগিরই করোনায় বিপর্যস্ত অসহায় ও দুস্থদের খাদ্যসেবা দিতে রেশনিং সিস্টেমের আদলে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি।
আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী সমকালকে বলেন, মহামারি শুরুর পর থেকেই সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দলটি সারাদেশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করছে। অসহায় ও দুস্থ মানুষের মধ্যে সারাদেশে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন জেনারেল হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাস্ক, অ্যান্টিসেপটিক সোপ, পিইপি ছাড়াও হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ করোনা সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনা সংকটের শুরু থেকেই নেতাকর্মীরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ পরিস্থিতির পুরোপুরি উত্তরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
চিকিৎসাসেবায় প্রাধান্য বিএনপির :গত বছর করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার আগে থেকেই জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, করোনা সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে বিএনপি। লকডাউন চলাকালীন ও তারপরে সারাদেশে প্রায় দুই কোটি অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থের মাঝে খাবারসামগ্রী বিতরণ করা হয় বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে বিএনপি মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবায় প্রাধান্য দিচ্ছে। এরই মধ্যে করোনা সংক্রমিত এলাকা হিসেবে পরিচিত বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) উদ্যোগে প্রায় ২০০ চিকিৎসক হটলাইনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। বিভিন্ন জেলায় 'হেল্প সেন্টার' চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে করোনার চিকিৎসাসামগ্রী প্রদান, হাসপাতালে রোগীদের অক্সিজেন সিলিন্ডার, হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সরবরাহ, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, করোনা পরীক্ষাসহ রোগীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা এবং দরিদ্রদের জন্য ত্রাণ সহায়তা করা হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে।
করোনার শুরুতেই বিএনপির ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের কার্যক্রম পরিচালনায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির মাধ্যমে চলমান লকডাউনেও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এই কমিটির বাইরে বিভিন্ন আসনভিত্তিক দায়িত্বশীল নেতারাও নিজ নিজ এলাকায় সাধ্যমতো ত্রাণ সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধে এবার দৃশ্যমান ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে দলের প্রতিটি জেলা কার্যালয়ে 'হেল্প সেন্টার' খোলা হয়েছে। সেখান থেকে ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তার সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাদের এ কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এদিকে, বিএনপির কয়েকজন নেতা রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কমবেশি ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নিজ নিজ এলাকায়, ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক রাজধানীর রূপনগর ও পল্লবী এলাকায় এবং নির্বাহী সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি ধানমন্ডি এলাকায় সহযোগিতামূলক কাজ করছেন। অন্যদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন এবারও ত্রাণ তৎপরতা ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে মাঠে রয়েছেন। তবে এবার তিনি দলের ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদেরই প্রাধান্য দিচ্ছেন বেশি। এরই মধ্যে গেণ্ডারিয়া সুইপার কলোনি ও মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ইশরাকের পক্ষে এই ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার বাইরে খুলনার খালিশপুর এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে সরব রয়েছেন বিএনপি নেতা রকিবুল ইসলাম বকুল। দলের ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় নেতাকর্মীসহ দরিদ্র মানুষকে ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের জন্যও গোপনে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। টাঙ্গাইল জেলায় যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকায় করোনা আক্রান্ত ও দুস্থদের সাহায্য কার্যক্রম পরিচালনা করছেন থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান সুমন। এভাবে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দলের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ নিজেদের মতো করে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিএনপি নেতা প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, লোকসমাগম এড়াতে এবার কমিটি গঠন করে দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে খাবার সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নিয়েও দুই-একদিনের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করবেন তিনি।
রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, খুলনায় ভয়াবহ করোনা সংক্রমণ চলছে। হাসপাতালগুলোতে জায়গা নেই, বেশি সংকট চলছে অক্সিজেন সিলিন্ডারের। মানুষের জীবন বাঁচাতে তাই এবার অক্সিজেন সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।