ঔপৌরসভা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে গত জানুয়ারিতে ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল জাতীয় পার্টি (জাপা)। আন্দোলনে না নামলেও সেই থেকে দলটির নেতারা নানা ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করে আসছেন। করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা, টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বাজেট, কর্মসংস্থানসহ নানা বিষয়েই জাপার কণ্ঠে এখন আওয়ামী লীগের উল্টো সুর।
'গৃহপালিত বিরোধী দলের' তকমা পাওয়া জাপা কেন সমালোচকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সরকারের সমালোচনা করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তারা সেই কাজই করছেন।
এরই মধ্যে জাপাকে ঘিরে নতুন কৌতূহলের কারণ হয়ে উঠেছে জাপার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক জাপার রাজনীতিতে ফেরার ও সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা। তার ও এরশাদের ছেলে শাহাতা জারাব এরিক হঠাৎ বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান করে 'কমিটি' ঘোষণা দিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছেন। যদিও জাপা নেতারা এ ঘটনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া বলেছেন, আলোচনায় আসতে এসব করছেন বিদিশা। তার সঙ্গে অনেকেই আছেন এ ধরনের ঘোষণা দিয়ে দলে গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
আদতে বিদিশার সঙ্গে দলের কমিটি থেকে বাদ পড়া কয়েক নেতা ছাড়া আর কেউ নেই। স্বয়ং রওশন এরশাদ বলে দিয়েছেন তিনি চেয়ারম্যান হতে চান না। তারপর আর কী কথা আছে?
তবে জাপা নেতারা জানিয়েছেন, বিদিশা কোনো ইস্যু নয়। তিনি বর্তমান নেতৃত্বকে বিব্রত করতে পারলেও চাপে ফেলতে পারেননি। জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন দলটির অগ্রাধিকার হলো, রাজনীতিতে টিকে থাকতে 'গৃহপালিত বিরোধী দল' তকমা ঝেড়ে ফেলে প্রকৃত বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন। এ কারণেই তারা বক্তৃতা-বিবৃতিতে সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে সরকারের সঙ্গে শত্রুতা নয়, সুসম্পর্ক রেখেই এ ভূমিকা পালন করতে চায় জাপা। সংসদে আসন কম হলেও সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিএনপিই বিরোধী দলের মর্যাদা পাচ্ছে; এই জায়গাটি নিতে চায় জাপা। আবার আগামী সংসদ নির্বাচনে যে 'প্রক্রিয়াতেই' হোক, আওয়ামী লীগের জোটেও থাকতে চায় জাপা।
তবে জাপার চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠসহ দলটির নিয়ন্ত্রণকারী নেতাদের দুইজন সমকাল বলেছেন, চাইলেই বিরোধী দল হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, পৌর নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিয়েছিল জাপা। দলের নেতাকর্মীদেরও ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ ছিল না। তারপরও ইউপি ভোটে অংশ নিতে হয়েছে জাপাকে।
এ বিষয়ে জাপা মহাসচিব সমকালকে বলেছেন, নির্বাচনে যে সরকারি দল কারচুপি, জালজালিয়াতি করে তা 'এক্সপোজ' করতেই তারা ভোট অংশ নিচ্ছেন। জাপা অংশ না নিলে আওয়ামী লীগ বলত, ভোটে কেউ থাকে না বলেই তারা জয়ী হয়। জাপা অংশ নেওয়ায় দেশবাসী দেখতে পাচ্ছে আওয়ামী লীগ কোন কায়দায় ভোটে জিতছে।
তিন শতাধিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাত্র দুটিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন লাঙ্গলের প্রার্থীরা। নানা জায়গায় দলের মনোনয়ন নিয়েও জাপার প্রার্থীরা নৌকার সমর্থনে ভোট থেকে সরে গেছেন। একই অবস্থা দেখা গেছে সংসদের উপনির্বাচনে। দলীয় মনোনয়ন নিয়েও জাপার প্রার্থীরা কুমিল্লা-৫ এবং ঢাকা-১৪ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আবার বাজেটের নানা সমালোচনা করলেও সংসদে তা পাসে জাপা সমর্থন করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা, তার পদত্যাগ, স্বাস্থ্য খাতে আরও বরাদ্দের দাবিতে সংসদে জাপার এমপিরা মুখর হলেও বাজেটের বিপক্ষে ভোট দেননি। জাপার একজন কো-চেয়ারম্যান সমকালকে বলেছেন, এভাবেই 'ভারসাম্য' রক্ষা করেই চলতে হবে।
তবে জিয়াউদ্দিন বাবলু বলছেন, এটা জাপার কৌশল। সংসদে তিনশ আসনই আওয়ামী লীগের। হ্যাঁ-না সংসদ চলছে। জাপা এমপিরা 'না' বললেও কিছু হবে না।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার মিত্রতা প্রায় দুই যুগের। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনে জেল থেকে সমর্থন করেন এরশাদ। সরকারেও যোগ দেয় জাপা। যদিও তিন বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপির সঙ্গে জোটে গিয়েছিলেন এরশাদ। তবে এক বছরের বেশি থাকেননি সে জোটে। ২০০১ সালে নির্বাচনে একাই লড়ে জাপা।
২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেন এরশাদ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। ২০১৩ সালের অক্টোবরে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেন এরশাদ। জোটে ফের আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিলেও ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকেই ভোটে অংশ নেন। যদিও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। তার স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলের একাংশ বিএনপিবিহীন ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
পরের পাঁচ বছরে এরশাদ ও জাপা নেতারা বহুবার বলেছেন, একাদশ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই লাঙ্গলের প্রার্থী থাকবে। কিন্তু ১৫৬ আসনে প্রার্থী দিয়েও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেই ভোট করে জাপা। এরশাদের মৃত্যুর পর চেয়ারম্যান পদে বসে দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জিএম কাদের বলেছেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সব আসনে প্রার্থী দেবে জাপা।
তবে জিএম কাদেরের এ ঘোষণাকেও দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে জাপা অভাবনীয়ভাবে বিএনপির প্রায় চারগুণ ২২টি আসন পেলেও সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে এককভাবে লড়ে ধানের শীষের সিকিভাগ ভোটও পড়ছে না লাঙ্গলে। বিএনপি যেসব নির্বাচন বর্জন করছে, সেখানেও আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারছে না জাপা। থাকছে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে।
জাপার সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য তথা সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, এত স্পস্ট একটা সুযোগ আসার পরও বিএনপি স্থান করে নিতে পারছে না। ধানের শীষ নির্বাচনে না থাকলেও সেই ভোট লাঙ্গলে আসছে না। অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকার পরও জাপাকে শক্তিশালী করতে না পারার দায় বর্তমান নেতৃত্বকেই দিচ্ছেন রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গোলাম মসিহ। তিনি বলেছেন, 'কারেন্ট লিডারশিপের ক্যাপাবিলিটি নিয়ে কিছু কথা থেকেই যাচ্ছে।
বর্তমান এমপি এবং জাপার কো-চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন এমন এক নেতা বলেন, আসল সমস্যা হলো সরকারের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতা। এ কারণেই সাধারণ মানুষ জাপাকে বিকল্প ভাবছে না; ভাবে না। আওয়ামী লীগের 'বি টিম' মনে করে। তাই বিএনপির ভোট জাপার দিকে আসছে না। বর্তমানে বিরোধী দলশূন্য রাজনীতিতে জাপার সুযোগ রয়েছে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসার। এ জন্য মাঠে নেমে কঠিন অবস্থান নিয়ে সরকারের বিরোধিতা করতে হবে। তাহলে ধানের শীষের ভোট লাঙ্গলে আসতে পারে। কিন্তু সরকারের তীব্র বিরোধিতা করতে গেলে জাপার অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। তাই টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা। মুখ রক্ষায় কিছু সমালোচনা ও বিরোধিতা হতে পারে। এর বেশি জাপার কাছে প্রত্যাশা করা ভুল হবে। স্বয়ং এরশাদই তা করতে পারেননি।
জাপার এমপিদের সংসদীয় এলাকায় প্রধান প্রতিপক্ষ হলেন তাদের কারণে দলের মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের বিরোধ অনেকটা একটি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মতোই। জাপার এমপিদের সমর্থন দিতে হচ্ছে এলাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর বিরোধী নেতাদের। লাঙ্গলের তিনজন এমপির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি দলের একটি পক্ষকে কাছে টেনেই এলাকায় টিকে আছেন তারা। আর বর্তমান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী বাস্তবতায় জিততে হলে আগামীতেও আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকতে হবে। বক্তৃতায় সরকারের বিরোধিতা করে হাততালি পাওয়া গেলেও নির্বাচনে উতরানো যাবে না।