রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারা মোড়ে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে চেকপোস্ট বসায় পুলিশ। সেখানে বিভিন্ন যান থামিয়ে চালক ও আরোহীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসা, স্বজনের অসুস্থতা বা মৃত্যুর মতো জরুরি কারণে বের হওয়ার কথা জানান তারা। ফলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। ব্যতিক্রম দু-একটি ঘটনায় উপযুক্ত জরুরি কারণ না পাওয়ায় জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দেখা যায় এমন চিত্র। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, লকডাউন কঠোরভাবেই পালিত হচ্ছে। ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে ঘরের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে।
করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান কঠোর লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের চাপ ছিল কম। চোখে পড়েছে শুধু রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়িতে ভাড়ায় যাত্রী বহনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট এবং নগরজুড়েই সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা চোখে পড়েছে। ফলে ছাড় পাননি আইন অমান্যকারীরা। অযথা ঘরের বাইরে বের হওয়ায় গতকাল ঢাকায় ৩৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৩৭ জনকে মোট ৯৫ হাজার ২৩০ টাকা জরিমানা করেছেন। ট্রাফিক বিভাগ ৪৪১টি যানকে মোট ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
এদিকে কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে সারাদেশে ১৮৬টি চেকপোস্ট পরিচালনা করে র‌্যাব। এ সময় টহল দেয় র‌্যাবের ১৮০টি দল। জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি র‌্যাবের ২৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালতও অভিযান চালায়। বিধিনিষেধ অমান্য করায় ২১২ জনকে এক লাখ ৯১ হাজার ৪৭০ টাকা জরিমানা করা হয়।
সরেজমিনে ফার্মগেট, গ্রিন রোড, কারওয়ান বাজার, এফডিসি মোড়, মগবাজার ও সাতরাস্তা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কড়াভাবেই পালিত হচ্ছে লকডাউন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকে ঈদের ছুটি কাটিয়ে এখনও ঢাকায় ফেরেননি, আবার অনেকে ঢাকায় থাকলেও ঘরেই রয়েছেন। মূল সড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচল কম।
কারওয়ান বাজার মোড়ে কর্তব্যরত সার্জেন্ট মতিউর রহমান সমকালকে বলেন, নানা কারণে দু-এক দিন পর থেকে সড়কে লোকজনের চাপ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে পুলিশ তৎপর রয়েছে, উপযুক্ত কারণ ছাড়া কেউ বের হলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। আশার ব্যাপার হলো, এবার দেখা যাচ্ছে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
পুলিশের এই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার আগে চেকপোস্টে একটি প্রাইভেটকার থামান কর্তব্যরত কর্মকর্তারা। আরোহী নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে যাচাইয়ের স্বার্থে পুলিশ জানতে চান, পরিচয় নিশ্চিত করার মতো কোনো কিছু আছে কিনা। এতে ওই ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে পুলিশের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে অবশ্য তিনি পরিচয়পত্র দেখান এবং উপস্থিত জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি শান্ত করেন।
ফার্মগেট মোড়েও রয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। সেখানে পুলিশের সামনেই 'জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়' লেখা একটি বাস থামিয়ে ভাড়ায় যাত্রী তোলা হচ্ছিল। পুলিশ তৎপর হওয়ার আগেই বাসটি চলে যায়। এই পয়েন্টে দায়িত্ব পালনকারী সার্জেন্ট রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, পুলিশকে নানাভাবে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে চেষ্টা সফল হচ্ছে না। আবার মানবিক কারণে অনেককে ছেড়ে দিতে হয়। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের অসুস্থতা বা মৃত্যুর কথা বলেন। তাৎক্ষণিক এত কিছু যাচাই করার সুযোগ থাকে না। আবার তাদের বক্তব্য সঠিক হলে আটকে রাখাও ঠিক নয়।
পুলিশের এ কর্মকর্তা আরও জানান, চেকপোস্টে থামানোর পর কেউ কেউ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলেন। তবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে দেখা যায় বিষয়টি ভুয়া। একটি ঘটনায় ২০১৭ সালের একটি প্রেসক্রিপশন দেখান এক ব্যক্তি। রোগী কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়িতে। তাহলে চিকিৎসক কীভাবে দেখবেন? জবাবে ওই ব্যক্তি জানান, ভার্চুয়ালি দেখাবেন।
লকডাউনে ভাড়ায় যাত্রীবাহী যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে অতিরিক্ত ভাড়ায় যাত্রী বহন করা হচ্ছে। ময়মনসিংহের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ফিরোজ হাসান জানান, ঈদের ছুটিতে ঢাকা এসেছিলেন। তবে রোববার জরুরি ভিত্তিতে তাকে কর্মস্থলে যেতে বলা হয়েছে। কীভাবে যাবেন, কোনো ধারণা ছিল না। বের হওয়ার পর আগারগাঁওয়ে ভাড়ায় চালিত একটি মোটরসাইকেল পান। ৪৫০ টাকায় তাকে আবদুল্লাহপুর পৌঁছে দেন চালক। পথে কোথাও তাকে পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়নি। পরে হেঁটে টঙ্গী ব্রিজ পার হয়ে তিনি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারে ময়মনসিংহ পৌঁছেন।
বিভিন্ন পয়েন্টে সন্দেহজনক এমন কিছু প্রাইভেটকার আটকানো হয়েছে বলে জানালেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে তারা সবাই নানা রকম জরুরি কাজের কথা জানিয়েছেন। ফলে বেশিরভাগকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।