জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আবারও নতুন কোনো রাজনৈতিক মোর্চা বা প্ল্যাটফর্ম হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, 'আমার দল (গণফোরাম) যাতে রাজনীতিতে কার্যকরভাবে কিছু করতে পারে, সে চেষ্টা তো আছেই। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যেটা আছে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। এর চেয়ে বেটার (রাজনৈতিক মোর্চা বা প্ল্যাটফর্ম) কিছু যদি করা যায়, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। তবে ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে আমরা আগে কাজ করেছি, এখন মাঠে সেভাবে কিছু হচ্ছে না বলে সেটাকে আবারও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।'
সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রবীণ এই দেশবরেণ্য আইনজ্ঞ আরও বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রভাবমুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। তবে এটা বলা সহজ, করা কঠিন। শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রভাব থেকেই যায়। সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন করোনাকালে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে তার মতামত তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন : বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন বলে মনে করছেন? কোনো সংকট দেখছেন?
উত্তর : করোনা পরিস্থিতিতে মানুষজনের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় লকডাউন ছিল। এসব কারণে রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা হওয়া উচিত, সেটি হয়নি। এখনও হচ্ছে না।
একটা অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। স্বাভাবিক অবস্থা এলে রাজনীতিতে এখন যে অবস্থা রয়েছে, তার অবসান হবে।
প্রশ্ন : করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই সংকট মোকাবিলায় সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই পদক্ষেপ কি যথেষ্ট?
উত্তর : সরকার আরও কী করতে পারত, সেটা বলা মুশকিল। তবে এখনও যেটা করেছে, সেটাকে বরং সবাই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছে। লকডাউন বলেন, টিকা কর্মসূচি যেটাই হোক- এগুলোর দরকার ছিল। এখানে অবশ্য এসব বিষয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে মতবিনিময় করে, তথ্য সংগ্রহ করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা করা যেত। সেটি হলে আরও ইতিবাচক হতো। বিশেষ করে টিকার যে ঘাটতি আছে, সেটি মোকাবিলায় সরকারের তৎপরতা আরও আগেই জোরদার করা উচিত ছিল। এরই মধ্যে বিদেশ থেকে সরকার অনেক টিকা সংগ্রহ করেছে। চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে সামনে যাতে আর টিকার সংকট না হয়, সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
প্রশ্ন : সামাজিক পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট ছিল কিনা?
উত্তর : করোনার ঝুঁকির কথা চিন্তা করে অনেকে সেভাবে ভূমিকা নেয়নি; বরং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করেছে। কিন্তু এখানে সবারই দায়িত্ব ছিল। এখনও যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, যারা এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এর বাইরে তারা (সামাজিক নেতৃবৃন্দ) জনগণকে সচেতন করার জন্য, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য দেশে-বিদেশে খোঁজখবর নিয়ে মতবিনিময় করে সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রশ্ন : মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশাসনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসছে। সর্বশেষ বরিশালের একটি ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। এই সংকটের কারণ কী এবং পরিত্রাণ কী হাতে পারে?
উত্তর : এটা এখন শুধু নয়, স্বার্থকে কেন্দ্র করে সব সময়ই হয়ে আসছে। এখানে সমস্যা হচ্ছে নিজে নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র (প্রাধান্য দিয়েছেন) করেছেন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে- দলীয় স্বার্থ হয়তো সবার ভিন্ন থাকতে পারে। মূল যেটা হওয়া উচিত দেশের স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ। সেগুলোর ব্যাপারে যাতে তারা কাছাকাছি আসতে পারে, সেখানে যাতে কোনো দ্বন্দ্ব না হয়, সেই চেষ্টা সংশ্নিষ্টদের করতে হবে।
প্রশ্ন : করোনায় আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল? প্রবীণ আইনজ্ঞ হিসেবে দেশের বিচারব্যবস্থার বর্তমান সংকট ও এর পরিত্রাণ নিয়ে সরকারের করণীয় কী হতে পারে বলে মনে করেন?
উত্তর : দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ ছিল। কিছুদিন হলো আদালত খুলেছে। এখন বিচার বিভাগের ঘাটতিগুলো সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত, কতটা ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য যদি বিচার বিভাগে বিচারক ও জনবল বাড়ানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে তা মূল্যায়ন করে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তা ছাড়া ভার্চুয়াল আদালত যেটি আছে, সেটিকে কীভাবে আরও বেশি কার্যকর করা যায় তার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। এর ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সেটিই দ্রুত হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : এবার রাজনৈতিক প্রসঙ্গে আসা যাক- দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আর দুই বছর চার মাস বাকি। রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা ও প্রস্তুতি রয়েছে কিনা, থাকলে কতটা জনবান্ধব?
উত্তর : করোনার কারণে এখনও সেভাবে কোনো দল নির্বাচনমুখী হয়েছে- এমনটি নজরে আসেনি। জাতীয় নির্বাচন একটি বড় বিষয়। এখানে অনেক বিষয় কাজ করে। এ সময়ে কেউ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সেটি মনে হচ্ছে না।
প্রশ্ন : বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে, পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের রূপরেখা কী হওয়া উচিত?
উত্তর : নীতিগতভাবে আমরা সবাই চাই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সে জন্য প্রয়োজন দলীয় প্রভাবমুক্ত নির্বাচন কমিশন। সারাজীবন ধরেই আমরা এমন দাবি করে আসছি। তবে এটা বলা সহজ; করা কঠিন। সরকারকেই এ ব্যাপারে অগ্রণী হতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনে যাতে সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের বাছাই করে আনা যায়। আবারও বলছি, এটা বলা সহজ। কিন্তু আমরা দেখে আসছি, শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রভাব থেকেই যায়।
প্রশ্ন : আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আপনার দল গণফোরাম কী ভাবছে? আপনার নেতৃত্বে আবারও কোনো ধরনের রাজনৈতিক মোর্চা বা প্ল্যাটফর্ম গড়া হবে কিনা? জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেরই বা বর্তমান অবস্থা কী?
উত্তর : আমার দল (গণফোরাম) যাতে রাজনীতিতে কার্যকরভাবে কিছু করতে পারে, সে চেষ্টা তো আছেই। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যেটা আছে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। এর চেয়ে বেটার (রাজনৈতিক মোর্চা বা প্ল্যাটফর্ম) কিছু যদি করা যায়, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। তবে ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে আমরা আগে কাজ করেছি, এখন মাঠে সেভাবে কিছু হচ্ছে না বলে সেটাকে আবারও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রশ্ন : বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করুন?
উত্তর : বিরোধী দলগুলোর আরও ইতিবাচক ভূমিকা থাকা উচিত। বিশেষ করে দায়িত্বশীলভাবে তারা জনগণের পক্ষে কাজ করবেন, এটি আমাদের আকাঙ্ক্ষা। বাস্তবতা হলো, সব সময়ই এর ঘাটতি থাকে। তাদের যেটা করা উচিত, তারা সেটি যথাযথভাবে করতে পারে না বা করছে না।
প্রশ্ন : যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে অনেক দিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : জামায়াতকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে তো আমরা সব সময়ই বলে আসছি। তাদের বাদ দেওয়া উচিত। কিন্তু যারা এটি করবে, তাদের তো আমরা বাধ্য করতে পারি না। এটি তাদের বিষয়।
প্রশ্ন : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ ও সাজাপ্রাপ্ত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতৃত্বে তাদের থাকাটা কতটা সমীচীন?
উত্তর : এটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা তো কাউকে বাধ্য করতে পারি না।
প্রশ্ন : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জড়িত বলে আওয়ামী লীগের নেতারা সম্প্রতি আবারও অভিযোগ তুলছেন? আপনার বক্তব্য কী?
উত্তর : যদি প্রমাণ করা যায়, তাহলে অবশ্যই সেটা করা উচিত। এভাবে অভিযোগ তুলে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রমাণও করতে হবে। পুরো জাতির জানা দরকার হত্যাকাণ্ডে কাদের ভূমিকা ছিল। হত্যাকাণ্ডে যে কেউ দায়ী থাকুক, কারও কোনো ভূমিকা থাকলে সেটাও প্রকাশ্যে আসা উচিত।
প্রশ্ন : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের এই সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম মূল্যায়ন করুন? প্রবীণ রাজনীতিক হিসেবে দলটির কাছে আপনার প্রত্যাশা?
উত্তর : সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দলীয়করণমুক্ত হয়ে দেশের মানুষের জন্য ঐক্যের রাজনীতি করবে। তারা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। তাই দেশের মূল বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে যে বিরোধ আছে, সেটা তারা নিরসনে উদ্যোগ নেবে। সর্বত্র জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে, সুসংহত করবে। সে জন্য আওয়ামী লীগকে গঠনমূলক রাজনৈতিক ঐক্যের দিকে মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন দলের সঙ্গে বসতে হবে, আলোচনা করতে হবে। একটি লক্ষ্য ঠিক করে মানুষকে ঐক্যের মধ্যে নিয়ে যাওয়া দরকার; দলাদলি না করি।
প্রশ্ন : এ মুহূর্তে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর : করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সে জন্য সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে, তাদের সক্রিয় রাখতে ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন : আপনার এখন ৮৫ বছর চলছে। করোনায় জীবনযাপনও অনেকটা থমকে আছে? কীভাবে দিন কাটছে, জনগণের কাছে আপনার কোনো বার্তা আছে কিনা?
উত্তর : প্রতিদিনই চেম্বারে (মতিঝিলে ল চেম্বার) আসছি, আধাবেলা থেকে যাই। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। জনগণের কাছে বার্তা এটুকুই- জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে সরব হোন। ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলুন। সংবিধান সমুন্নত রাখুন।
প্রশ্ন : আপনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এখনও কীভাবে আপনার মূল্যায়নে জাগরূক হয়ে আছেন?
উত্তর : বঙ্গবন্ধু আমার সকল প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন, থাকবেন। তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে কী করতেন, কী ভাবতেন, তার চিন্তাধারাগুলো কী ছিল, কী উদ্যোগ নিতেন- সেগুলো আমাকে ভাবায়।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর 'চিন্তাধারা' রাজনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?
উত্তর : কিছুটা তো নিশ্চয়ই হচ্ছে। তবে আরও অনেক কিছু করা যেতে পারে।

বিষয় : সাক্ষাৎকার: ড. কামাল হোসেন

মন্তব্য করুন