ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠককে 'ইতিবাচক' হিসেবেই বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষক ও দলের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, এ বৈঠকের লক্ষ্য ও সিদ্ধান্ত দলীয় কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হতে হবে। দলকে আন্দোলনমুখী করার টার্গেট নিয়ে এগোতে হবে। তা না হলে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠকে একদিকে যেমন দলের মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি বার্তাও সারাদেশে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। নির্দলীয় সরকার ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যে অংশ নিচ্ছে না- দলের এমন বার্তাও আওয়ামী লীগ সরকারসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির ধারাবাহিক এ বৈঠক সম্পর্কে বলেছেন, 'এতদিন পর বিএনপি নড়েচড়ে উঠেছে। এটা অবশ্যই শুভ লক্ষণ। বিষয়টিকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু দেখতে হবে- এই তিন দিন ধরে বৈঠকে নেতারা যা বলছেন, তা কাজেকর্মে প্রমাণ করছেন কিনা। তাদের এসব মাঠেও প্রয়োগ করে দেখাতে হবে।' বিএনপিকে জরুরি কাউন্সিল করারও তাগিদ দেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ বলেন, বিএনপির ধারাবাহিক এই বৈঠকের বিষয়টি আরও পরিস্কারভাবে বোঝার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্বজুড়ে 'ইনক্লুসিভ'- এই শব্দটি প্রচলিত; যা কিছু করো, সবাইকে নিয়ে করো। বৈঠকে অনেকে বক্তৃতা দিয়েছেন, অনেকে মতামত দিয়েছেন। এখন তাদের মতামতকে নিয়ে দলের কর্মপন্থা ঠিক করা হবে। বিএনপিতে এ ধরনের মতবিনিময় সভা আরও বেশি হওয়া দরকার। আর তা এত দীর্ঘ ব্যবধানে হওয়া উচিত নয়।

দলীয় সূত্র জানায়, ধারাবাহিক বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির কী করা উচিত, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আন্দোলনের কর্মকৌশল কী হওয়া উচিত, মাঠ পর্যায়ের সংগঠনকে আরও সক্রিয় করতে কী করা প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয়ে নেতারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন।

গত মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ধারাবাহিক এসব বৈঠক হয়। এতে প্রথম দিন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টামণ্ডলী, দ্বিতীয় দিন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহসম্পাদক এবং শেষ দিন দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন। তিন দিনের ধারাবাহিক বৈঠকে মোট ২৮৬ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে ১১৮ জন বক্তব্য দিয়েছেন।

আজ শনিবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের নির্বাহী কমিটি ও সারাদেশে জেলা পর্যায়ের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ধারাবাহিক এ বৈঠকের অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গেও সংলাপ হতে পারে। সবার মতামতের পরই চূড়ান্ত করা হবে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কৌশল।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, তিন দিনের ধারাবাহিক বৈঠকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কী করণীয় এবং আমাদের সংগঠনের অবস্থা কেমন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এসব বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন এবং নেতাদের মতামত শুনেছেন। আমরা আরও কিছু সভা করব। দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা নেতাদের নিয়েও সভা করব। তাদের মতামত শুনব। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এসব বৈঠক থেকে কী পাওয়া গেল- এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখনই এ সম্পর্কে কিছু বলার সময় আসেনি। সবকিছুই সময়মতো আপনাদের জানাতে পারব। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে করণীয় বিষয়ে নেতারা নিজ নিজ বক্তব্য রেখেছেন। দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তারা তাদের মতামত তুলে ধরেছেন। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়- এটা সবাই উপলব্ধি করছেন। তাই সরকারের পতন আন্দোলনের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন।

বিএনপি নেতারা জানান, ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। এবারই প্রথম তিনি ধারাবাহিক বৈঠকের আয়োজন করছেন, সবার মতামত নিচ্ছেন। এসব বৈঠকের মাধ্যমে একদিকে তিনি দলে নিজের নেতৃত্ব সুসংহত করছেন, অন্যদিকে দলকে আন্দোলনমুখী করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে দলের কৌশল কী হতে পারে, তা নিয়েও নেতাদের মতামত নিয়েছেন তিনি। দলের অঙ্গ-সংগঠনকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় বিএনপির ৯টি অঙ্গ-সংগঠন ও দুটি সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের বিষয়েও ভাবতে শুরু করেছে হাইকমান্ড। এ বিষয় নিয়ে আজ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হবে।

ধারাবাহিক এ তিন বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের বেশিরভাগ নেতাই সরকারবিরোধী এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকে নেতাদের অনেকে সংগঠনকে শক্তিশালী করে আন্দোলনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তারা দলের সাংগঠনিক অবস্থাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না, কমিটিতে স্থান পেতে নানা লবিং-তদ্বির হচ্ছে। মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে কমিটির জন্য তদ্বির করা হচ্ছে। তারা বলেন, দল ও অঙ্গ-সংগঠনে কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে রাস্তায় নেমে কোনো লাভ হবে না। আন্দোলনের জন্য সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

এ অভিমতের সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করে কোনো কোনো নেতা আন্দোলন ও সংগঠন একই সঙ্গে করার পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। তারা বলছেন, সবকিছু ঠিক করে আন্দোলনে নামা যায় না। আন্দোলন শুরু হলে সবকিছু ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। দল পুনর্গঠন সম্পন্ন করে আন্দোলনে নামতে হবে- এমন ভাবার কোনো মানে নেই। আন্দোলনের পাশাপাশি পুনর্গঠনও চলবে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, তারেক রহমান আরও অনেক নেতার সঙ্গে কথা বলবেন। পেশাজীবীদের সঙ্গেও কথা বলবেন। তবে শীর্ষ তিন বৈঠকে দেখা গেছে, নেতাকর্মীদের মধ্যে এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে না গিয়ে বরং মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন করার মনোভাব রয়েছে। পাশাপাশি, এসব বৈঠকের মধ্য দিয়ে সরকারি দল ও আন্তর্জাতিক মহলে 'বিএনপিকে কোনো রাজনৈতিক ফাঁদে আর ফেলা যাবে না' এমন আগাম বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে কিছু বন্ধু পাওয়ার ইঙ্গিতও মিলেছে এ বৈঠক থেকে। এসব বৈঠকের মধ্য দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রাথমিক কর্ম সূচনা হলো বলে জানান তিনি।