ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, উপমহাদেশে ছাত্র রাজনীতির গোড়াপত্তনকারী ও উপমহাদেশের প্রথম 'র‌্যাংলার' হিসেবে ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান করে নিয়েছেন আনন্দমোহন বসু। অদম্য মেধাবী আনন্দমোহন বসু ১৮৬২ সালে হার্ডিঞ্জ স্কুল (বর্তমান ময়মনসিংহ জিলা স্কুল) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় নবম স্থান অধিকার করেন। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ এবং বিএ উভয় পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করে উত্তীর্ণ হন। এ অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তিনি 'প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ' বৃত্তি লাভ করেন। ফলে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা বৃত্তি লাভ করেন। ইংল্যান্ডে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে তিনি উচ্চতর গণিত বিষয়ে লেখাপড়া করেন। ১৮৭৪ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিষয়ক সর্বোচ্চ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনটি বিষয়ে প্রথম শ্রেণি অর্থাৎ সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে 'র‌্যাংলার' উপাধি পান আনন্দমোহন বসু। ওই বছরই তিনি বার-এট-ল ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন এবং আইন ব্যবসা শুরু করেন।
রাজনীতিতে তিনি ছিলেন স্বপ্টম্নদ্রষ্টা ও অগ্রদূত। ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশপ্রীতি জাগানোর উদ্দেশ্যে ১৮৭৫ সালে গঠন করেন 'স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন'। ১৮৭৬ সালে তিনি গঠন করেন ভারতবর্ষের জাতীয় কংগ্রেসের পূর্বসূরি সংগঠন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। ১৮৭৮ সালের ১৫ মে তিনি 'সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ' প্রতিষ্ঠা করেন। 'সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ'-এর তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি দু'বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব ভবন নির্মাণ এবং সমাজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'সিটি কলেজ' ও সিটি স্কুল স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন আনন্দমোহন বসু। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো, সিনেট সদস্য এবং শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ময়মনসিংহে কোনো কলেজ না থাকায় ১৮৯৯ সালে 'ময়মনসিংহ সভা' ও আঞ্জুমানিয়া ইসলামিয়া' আনন্দমোহন বসুর কাছে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। ১৯০১ সালে তিনি 'সিটি স্কুল'টিকে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজে উন্নীত করেন এবং ১৯০৮ সালে এর নামকরণ করা হয় আনন্দমোহন কলেজ।
পশ্চাৎপদ নারীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর সহযোগিতায় ১৮৭৬ সালে স্থাপন করেন 'বঙ্গ মহিলা মহাবিদ্যালয়'। যা পরে বেথুন স্কুলের সঙ্গে একীভূত হয়। আনন্দমোহন বসু ও দুর্গামোহন দাসের ঐকান্তিক চেষ্টায় বেথুন স্কুলের সর্বোচ্চ শ্রেণির দুই ছাত্রী কাদম্বিনী বসু ও সরলা দাস কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হন। এর ফলে ১৮৭৮ সালে কাদম্বিনী বসু প্রথম এন্ট্রান্স পাস মহিলা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়।
আজ বঙ্গীয় রেনেসাঁর অন্যতম স্থপতি র‌্যাংলার আনন্দমোহন বসুর ১৭৫তম জন্মদিবস। কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে ১৮৪৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯০৬ সালের ২০ আগস্ট মাত্র ৫৯ বছর বয়সে পক্ষাঘাত রোগে ভুগে মৃত্যু হয় তার। কীর্তিমান এ মানুষটির শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও একজন প্রগতিশীল সমাজকর্মী, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী, বিচক্ষণ কর্মযোগী, রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গীয় রেনেসাঁর উত্তরণে তার অবিস্মরণীয় অবদান তাকে অনাদিকাল বাঁচিয়ে রাখবে।
'র‌্যাংলার' আনন্দমোহন বসুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি বেদখল হয়ে আছে। ফলে ধ্বংস হচ্ছে সপ্তদশ শতাব্দীর স্থাপত্যশৈলীর অনুপম নিদর্শন বাড়িটি। কয়েক একর আয়তনের বাড়িটিতে রয়েছে কয়েকটি বিশাল ভবন, খোলা মাঠ ও একাধিক পুকুর। বিশাল বসতবাড়িটি পরিণত হয়েছে পরগাছা উদ্ভিদের বাসস্থানে। চারদিকে নির্মিত প্রতিরক্ষা দেয়ালের অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের অনেক জায়গার ইট-পাথর দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে গেছে। আনন্দমোহন বসুর আঁতুড়ঘরটিকে বানানো হয়েছে গোবরের গর্ত। এ অবস্থায় ঐতিহ্যের নিদর্শন এসব স্থাপনা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বসতবাড়িটি উদ্ধার কিংবা সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ বা আগ্রহ নেই প্রশাসন কিংবা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক এ স্থানটিকে সংরক্ষণ করে তার পুণ্য স্মৃতি এবং স্থাপত্যকীর্তির প্রতি সম্মান জানাবে- এ প্রত্যাশা এলাকাবাসীসহ সকলের।
সাংবাদিক
dulu1963@gmail.com