করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেড় বছর গৃহবন্দি হয়ে ছিল স্কুল শিক্ষার্থীরা। পড়াশোনার ব্যস্ততা না থাকায় অনেকে কাটিয়েছে অলস সময়। তবে বিজ্ঞানমনস্ক কেউ কেউ খুঁজেছে নতুন কিছু। আর সেই সবই উঠে এসেছে চিন্তার চাষ আয়োজিত ষষ্ঠ ক্ষুদে গবেষক সম্মেলনে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক স্কুল শিক্ষার্থী এবং বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণে শনিবার অনলাইনে দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ৮৫টি গবেষণাপত্র এবং ১১টি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেছে স্কুল শিক্ষার্থীরা।

সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রয়াসন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা খান। প্রথম পর্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান, ভারতের আগরতলার আইসিএফএএল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দুলাল দেবনাথ, অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী প্রমুখ।

পরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদ। বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি পাটশিল্প করপোরেশনের উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমেদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. এম. আকাশ, প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবা আই সেরাজ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুর রহমান। উদ্বোধনী ও পুরস্কার বিতরণীতে সভাপতিত্ব করেন চিন্তার চাষ-এর চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শফিকুর রহমান।

সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা তাদের গবেষণা ও ধারণাপত্র উপস্থাপন করে। তাতে দেখা যায়, স্কুলে শিক্ষার্থীরা গবেষণা করছে, কীভাবে বর্জ্য পানি পরিশোধন করা যায়। এজন্য তারা কেঁচো, কয়লা, কাঠের টুকরা, বালু ও পাথর ব্যবহার করেছে। পরীক্ষা করে দেখেছে, কোন পদ্ধতিতে বর্জ্য পানি পরিশোধন করে দ্রবীভূত অক্সিজেন ও মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ (টিডিএস) সঠিক মাত্রায় থাকে। কেউ কেউ দেখেছে কোন উৎস (মিনারেল ওয়াটার, টিউবওয়েলের পানি, ফিল্টারের পানি ও ওয়াসার পানি) থেকে পানি খেলে তা শরীরের ক্যালসিয়াম ও আয়রনের ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে।

শুধু যে বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা করেছে, তা নয়, তারা জীবন, সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা, সমাজ ও অর্থনীতি নিয়েও গবেষণা করেছে। কভিড পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের জীবনে কিরূপ প্রভাব বিস্তার করে, তাও তুলে ধরা হয়েছে। কৃষকরা ধান ও সবজি চাষ করলে কি ধরনের লাভ বা ক্ষতির শিকার হয়, বাঙালি সংস্কৃতি কীভাবে উপজাতীয়দের সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করছে ইত্যাদি নানা ধরনের গবেষণাপত্রও উপস্থাপন করা হয়।

ধারণাপত্রে প্রস্তাব এসেছে কীভাবে দুর্যোগ প্রবল এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায়। কীভাবে কৃষি কাজের জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা সেচের সময় জানতে এআই ব্যবহার করা যায়। কীভাবে শ্রমিকদের জন্য মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার করা যায়।

অনুষ্ঠানে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শুধু বিজ্ঞান নয়, সমাজ ও মানবজীবন নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। কৃষি গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। এজন্য আমাদের নীতিনির্ধারণীতে যারা রয়েছেন, তাদেরও এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

ড. হাসিনা খান বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে তথ্যভিত্তিক করার জন্য গবেষণা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বর্তমানে উদ্ভাবনের পাশাপাশি উদ্ভাবক সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। কারণ উদ্ভাবক জানে কীভাবে উদ্ভাবনকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়।

সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রতিপক্ষ হচ্ছে ভোগবাদ, পুঁজিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ। আমরা আমাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই সময় ফিরিয়ে আনতে চাই, যখন আমরা জগদীশ চন্দ্র বসু বা সত্যেন্দ্রনাথ বোসকে পেয়েছিলাম। আমরা অনেক আগে থেকেই সমৃদ্ধ ছিলাম কিন্তু আমরা আমাদের সমৃদ্ধি লালন করতে পারিনি। তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাতীয় সমৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ড. মোবারক আহমেদ খান বলেন, চিন্তা করার ক্ষমতা ঈশ্বর প্রদত্ত। কিন্তু তার লালন প্রয়োজন। তিনি বেশি বেশি বিজ্ঞান চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, সৃজনশীল চিন্তার জন্য প্রয়োজন জীবিকার বাইরে গিয়ে চিন্তা করা। যারা গবেষক তারা অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে চিন্তা করে না, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে। জ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ প্রয়োজন। নিজেকে বদলে দিতে হবে সেইসঙ্গে অন্যকেও বদলে দিতে হবে।

ড. জেবা আই সেরাজ বলেন, শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি যে আগ্রহ রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে যাতে তারা ভবিষ্যতে সমাজের জন্য কিছু একটা করতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, স্কুল শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত চমৎকার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

অধ্যাপক ড. মিসবাউজ্জামান বলেন, গবেষণা কার্যক্রমের সুফল জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে নেতৃত্ব প্রয়োজন। তা না হলে তা অন্য দেশের প্রয়োজনে চলে যাবে।

ড. দুলাল দেবনাথ বলেন, শিশুদের স্মার্ট ডিভাইসের অপকারিতা হতে দূরে রাখতে হলে তাদের এ ধরনের সৃজনশীল কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে উৎপন্ন এই কার্যক্রম সারা বিশ্বে চিন্তার চাষ ছড়িয়ে দিয়ে পারে তিনি সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অধ্যাপক বিশ্বজিত শিক্ষার্থীদের তাদের নিজস্ব চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।