কোনোভাবেই নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম। বরং বিভক্ত দলটির নেতারা নিজ নিজ বলয়ে শক্তি বৃদ্ধি করছেন। এতে একদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিভ্রান্তিতে পড়েছেন, অন্যদিকে সংগঠনটি দিন দিন আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।

নেতাকর্মীরা জানান, মূলত ড. কামাল হোসেনের উত্তরসূরি নিয়েই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। একটি অংশ দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টুু অপর অংশ সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানকে সমর্থন করছে। কেউ কোনো অংশকে ছাড় দিতে নারাজ। এর পরও দলের একটি অংশ বিবদমান অংশগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

জানা গেছে, দলটির একাংশ গণফোরামের রাজধানীর আরামবাগের ইডেন কমপ্লেক্সে আগের ঠিকানায় দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অপরাংশ পল্টনে নতুন অফিস ভাড়া নিয়েছে। নির্বাচন কমিশনে একাংশের নেতারা নিজেদের মূল দাবি করে চিঠি দিলেও ড. কামাল হোসেনের চিঠিতে তা বাতিল হয়ে যায়। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন অংশকেই নির্বাচন কমিশন বৈধতা দিয়েছে। এখন এ অংশটিই আগামী ৪ ডিসেম্বর বিশেষ কাউন্সিলের ঘোষণা দিয়েছে। অপরাংশ আগামী মাসে বর্ধিত সভা করে কাউন্সিলের ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কয়েকজন নেতার ভাষ্য, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন অংশটি রাজনৈতিক কার্যক্রমে ঝিমিয়ে পড়লেও অপরাংশ সারাদেশে কর্মী সভা করছে। ইতোমধ্যে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সফর শেষ করেছে তারা।

সূত্র জানায়, বিদ্রোহী অংশে দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী থাকলেও মূল অংশে ড. কামাল হোসেন রয়েছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীরা ড. কামাল হোসেনকে পছন্দ করেন, কিন্তু তার উত্তরসূরি হিসেবে মোকাব্বির খানকে অপছন্দ করেন। আবার অপরাংশের নেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টু, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক আবু সাইয়িদের মতো নেতাদের ঘিরে কর্মীদের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ কাজ করছে।

নেতাকর্মীরা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংসদে শপথ নেওয়া এবং বিশেষ কাউন্সিল ঘিরে গণফোরামে অনৈক্য সৃষ্টি হয়। ওই সময় দলের সাধারণ সম্পাদক করা হয় ড. রেজা কিবরিয়াকে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি অনেকে। পরে পাল্টাপাল্টি বহিস্কার ও কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত নেয় দুই পক্ষ। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে ৭১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন ড. কামাল হোসেন। এতে নেতাকর্মীদের ক্ষোভ আরও বাড়ে।

দুই অংশের এমন অবস্থানের কারণে বিরক্ত ড. কামাল হোসেন রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করেন। এতে দুই পক্ষই সুর নরম করতে থাকে। পরে ড. কামাল হোসেন দলকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। দুই পক্ষকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে সম্মিলিতভাবে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে চেষ্টা বিফলে যায়।

ওই সময় ড. কামাল হোসেন ও মোস্তফা মোহসীন মন্টু মিলে জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০ সদস্যের একটি খসড়া কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তুত করেন। যাতে ড. কামাল হোসেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি; মোস্তফা মোহসীন মন্টুকে ১ নং সদস্য করা হয়। কিন্তু তাতে বাদ সাধেন অপরাংশের নেতারা। খসড়া কমিটিতে মোস্তফা মোহসীন মন্টুর স্থলে মোকাব্বির খান নিজেকে ৫ নম্বর থেকে ১ নম্বর সদস্য করে নতুন খসড়া কমিটি প্রস্তুত করেন। কিন্তু তাতে সায় দেননি অপরাংশের নেতারা। ফলে ঐক্য প্রক্রিয়া আবারও ভেস্তে যায়।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৭ ফেব্রুয়ারি দল থেকে পদত্যাগ করেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া। পরে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শফিক উল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করেন ড. কামাল হোসেন। অতি সম্প্রতি মোকাব্বির খানকে নির্বাহী সভাপতি করা হয়। এসব সিদ্ধান্তকে অগঠনতান্ত্রিক হিসেবে দাবি করছে দলের অপরাংশ।

এর প্রতিবাদে ২৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভা করে ২৯ মে কাউন্সিল করার জন্য মোস্তফা মোহসীন মন্টুকে আহ্বায়ক করে কাউন্সিল প্রস্তুত কমিটি গঠন করে একাংশ। একই সঙ্গে সব পক্ষকে নিয়ে ২১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি ও ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন তারা, যা অপরাংশ মানেনি। এদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে ঘোষিত কাউন্সিলও করতে পারেননি বিদ্রোহী অংশের নেতারা।

এর পরও দলের মধ্যে চলা সংকট নিরসনে গত ২৫ আগস্ট গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের উদ্দেশে গণফোরাম নেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টু, আবু সাইয়িদ, সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার, মহসিন রশিদ ও মহীউদ্দিন আবদুল কাদের চিঠি লেখেন। তাতে বলা হয়, গঠনতন্ত্রবিরোধী ও এখতিয়ারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা, নিষ্ফ্ক্রিয়তা ও দলের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১৯ সালে জাতীয় কাউন্সিলে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডেকে পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণাসহ দলকে রক্ষার জন্য কামাল হোসেনের প্রতি আহ্বান জানান তারা। তবে সূত্র জানায়, দলের একাংশের এ চিঠির কোনো উত্তর এখনও দেননি ড. কামাল হোসেন। আগামীতেও তিনি কোনো জবাব দেবেন না বলে জানা গেছে।

এর মধ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মোকাব্বির খানের সভাপতিত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিল কমিটি গঠন করা হয়। এতে মোশতাক আহমেদকে আহ্বায়ক ও শাহ নুরুজ্জামানকে সদস্য সচিব করে কাউন্সিল প্রস্তুতি পরিষদ এবং গঠনতন্ত্র, অর্থ, দপ্তর, প্রচার, আপ্যায়ন, মঞ্চ, স্বেচ্ছাসেবক সম্পর্কিত ৭টি উপপরিষদ গঠন করা হয়। এ সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও গঠনতন্ত্রবিরোধী বলে দাবি করছে মন্টুর নেতৃত্বাধীন অংশটি। এখন উভয় অংশ নিজ নিজ বলয়কে নিয়ে পৃথক কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার মন্টু অংশের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন অংশের কাউন্সিল বন্ধে আদালতে রিট করা হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

এসব বিষয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন অংশের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আওম শফিক উল্লাহ সমকালকে বলেন, দলের ঐক্যের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়।

অপরাংশের নেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ গণফোরাম চাই। এখন আমরা বিভাগীয় কর্মী সম্মেলন করছি। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত নিচ্ছি। এর পর আমরা কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা বসে কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত নেব। সেখানে কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে। আমরা সবকিছু গঠনতান্ত্রিকভাবে করতে চাচ্ছি।