আর চার মাস পর শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ। এরই মধ্যে নতুন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। কীভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে, তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। সংবিধানে কমিশন গঠনে আইন তৈরির কথা উল্লেখ থাকলেও চার দশকের বেশি সময়েও তা হয়নি। ফলে প্রতিটি কমিশনের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক বিতর্ক এক ধরনের রীতিতে পরিণত হয়েছে।
এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আগের দুবারের মতো এবারও সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ একাধিক মন্ত্রী সরকারের মনোভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট করেছেন। অন্যদিকে, বিএনপির পাশাপাশি সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নির্বাচন কমিশন গঠনে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরাও আইন তৈরির কথা বলছেন।
সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, আগের দু'দফার মতোই এবারও সার্চ কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আগামী চার মাসের মধ্যেই নতুন ইসি গঠিত হবে।
সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, নতুন ইসিতে কারা থাকবেন, তা নিয়ে এরই মধ্যে আলাপ-আলোচনা জোরেশোরে শুরু হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পদে পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। তিনি বর্তমান ইসি গঠনে সার্চ কমিটির দায়িত্বে ছিলেন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি কমিশনার পদে গত দুই বছরের ধারাবাহিকতায় একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, একজন সাবেক জেলা জজ, সিভিল প্রশাসনের সাবেক একজন কর্মকর্তা ও একজন নারী সদস্য নিয়োগ পাচ্ছেন। এ জন্য একাধিক বিকল্প মাথায় রেখে কাজ চলছে।
তবে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াকে 'জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি' বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'একেবারেই তাদের (সরকার) নিজস্ব লোকজনকে দিয়ে, তাদের প্রাধান্য দিয়ে (কমিশন) গঠন করা হয়। এটা জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি ছাড়া কিছু নয়। (তারা বলবে) সার্চ কমিটি করেছে, আমরা তো করি নাই, আমরা তো দিই নাই।'
তিনি বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে, তারও আগের অভিজ্ঞতা থেকে পরিস্কারভাবে দেখা গেছে, এটা সম্পূর্ণভাবে সরকার তার নিজের পছন্দমতো লোকজনকে দিয়ে তৈরি করে এবং সেটাকে নির্বাচনের কাজে লাগায়।
ইসি নিয়োগে আইন না হওয়ায় গত কয়েকটি মেয়াদে সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়ে আসছেন রাষ্ট্রপতি। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। এ রকম আলোচনায় বিএনপিও অংশ নিয়েছিল।
সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন চাই। ৫০ বছরেও কেউ এ আইন করেনি। যদি এ আইন থাকত, তাহলে প্রতিবার সার্চ কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিতর্ক হতো না। তখন নিয়ম অনুযায়ী এক মেয়াদ শেষ হলেই নির্বাচন কমিশন গঠন হয়ে যেত।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশিদ ফিরোজ সমকালকে বলেন, এসব সার্চ কমিটি দিয়ে কিছু হবে না। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা, কাজেই সংবিধান অনুযায়ীই আইন প্রণয়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করে তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। এই আইনের কাঠামোর মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের কার্যপরিধির উল্লেখ থাকবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও আইন প্রণয়নের কাজটি এড়িয়ে চলা হচ্ছে। এটি 'রহস্যজনক'। বর্তমানে ও অতীতে যেসব দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, সবাই এই কাজটি এড়িয়ে চলেছেন। একটি নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার তার দায় এড়াতে পারে বলে এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, 'যদিও সার্চ কমিটির গেজেট আইন নয়, কিন্তু আইনের কাছাকাছি।' তিনি বলেন, দাবি যতই উঠুক, এই অল্প সময়ের মধ্যে এখন নতুন আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের সুযোগ নেই। তাই সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন ইসি গঠন করা হবে। বিকল্প উপায় ভাবার সুযোগ নেই।
সার্চ কমিটির কী কাজ :নতুন নির্বাচন কমিশনের জন?্য নাম প্রস্তাব করাই সার্চ কমিটির কাজ। এ কমিটির প্রস্তাবিত তালিকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজনকে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির।
সংবিধানে বলা আছে, কমিশন-সংক্রান্ত একটি আইনের অধীন রাষ্ট্রপতি এ নিয়োগ দেবেন। তবে গত চার যুগেও এই আইন প্রণয়ন সম্ভব হয়নি। আগের রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের সময় প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে একটি সার্চ কমিটি করা হয়েছিল। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদও গত মেয়াদে একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তবে জিল্লুর রহমান চার সদসে?্যর সার্চ কমিটি করেছিলেন। আর বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ছয় সদসে?্যর সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন।
সার্চ কমিটিতে ছিলেন যারা :কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনে যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছিল তার সদস্য ছিলেন তৎকালীন আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, হাইকোর্টের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, পিএসসির চেয়ারম?্যান মোহাম্মদ সাদিক, সিএজি মাসুদ আহমেদ, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও শিরীণ আখতার। সার্চ কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব।
এর আগের সার্চ কমিটিতেও প্রধান ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। সদস্যদের মধ্যে হাইকোর্টের একজন বিচারক এবং পিএসপি চেয়ারম্যান ও সিএজি পদধারীরা কমিটিতে ছিলেন।
২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি ইসি নিয়োগে গঠিত প্রথম সার্চ কমিটি ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার মনোনয়নের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচটি নাম পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সব মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের নামের তালিকাও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে চাওয়া হয়েছিল। একইভাবে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের নামের তালিকা কমিটিতে পাঠানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া সার্চ কমিটির সদস্যরা নিজ বিবেচনায় যোগ্য ব্যক্তিদের নাম সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সব নাম নিয়ে বৈঠকে বসে সার্চ কমিটি। তারপর তারা সুপারিশের তালিকা চূড়ান্ত করে। গত মেয়াদেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের আমলে দেশের নির্বাচনী আইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। ওই সময়ে ইসি গঠন নিয়েও একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাদের ওই প্রস্তাব পরে আর গৃহীত হয়নি। ২০১১ সালের ২৯ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন হয়। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ চার নির্বাচন কমিশনার নিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠনের বিধান যুক্ত হয়। এর আগে কমিশনের সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না।
শামসুল হুদা কমিশনের ওই প্রস্তাবের সার্চ কমিটিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকমিশন চেয়ারম্যান ও মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ বিদায়ী সিইসিকে রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। এতে একজন নারী সদস্যকে রাখারও প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে কমিশনারদের পদ শূন্য হওয়ার কমপক্ষে এক মাস আগে সিইসিকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া কমিশন থেকে আকস্মিকভাবে কেউ পদত্যাগ করলে বা সরানো হলে সঙ্গে সঙ্গে সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়।
নির্বাচন কমিশনের আইন কর্মকর্তারা জানান, সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংবিধানে বা দেশের প্রচলিত আইনে কোনো যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়েছে। এ এখতিয়ার প্রয়োগে রাষ্ট্রপতি স্বাধীন নন। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে এ নিয়োগ দিতে হয়। যোগ্যতার শর্তাবলি না থাকায় যে কোনো ব্যক্তিকে এ পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একবার নিয়োগ পেলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ ছাড়া তাকে অপসারণের আইনগত কোনো সুযোগও নেই।
এর আগে দায়িত্বে ছিলেন যারা :স্বাধীনতার আগে ঢাকায় পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের একটি দপ্তর ছিল। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। দেশ স্বাধীন হলে তা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে রূপ নেয়।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে ১১ জন সিইসি ও ২৩ নির্বাচন কমিশনার এ পর্যন্ত নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে সামরিক শাসনামলে একজন সিইসির মেয়াদ বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। দেশের প্রথম সিইসি মো. ইদ্রিসের পাঁচ বছর মেয়াদ ১৯৭৭ সালের ৭ জুলাই শেষ হলে পরদিনই নিয়োগ পান বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম। এরশাদের শাসনামলে তিনি প্রায় আট বছর সিইসি ছিলেন। ১৯৮৫ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি নুরুল ইসলামের মেয়াদ শেষের দিনে নিয়োগ পান বিচারপতি চৌধুরী এ টি এম মাসুদ।
এরপর বিচারপতি সুলতান হোসেন খান ১৯৯০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সিইসি হন। তিনি ওই বছর ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিইসি ছিলেন। এরপর বিচারপতি আবদুর রউফ সিইসি হিসেবে নিয়োগ পান। পরের কমিশনে সিইসি হন বিচারপতি এ কে এম সাদেক। এরপর পর্যায়ক্রমে সিইসি হন মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ সাঈদ ও বিচারপতি এম এ আজিজ। এম এ আজিজের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্যরা রাজপথে আন্দোলনে নামেন। একপর্যায়ে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় কয়েক দফায় নিয়োগ পেয়ে একসঙ্গে সাতজন কমিশনার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের সবাই একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বে আসেন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন। এই মেয়াদে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নির্বাচনী আইনে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। ২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ কমিশন দায়িত্ব পালন করে। ওই সময় পর্যন্ত কমিশনের সদস্য সংখ্যা কতজন হবে, তা নির্দিষ্ট ছিল না। পরে সংবিধান সংশোধন করে সিইসিসহ কমিশনের সদস্য সংখ্যা পাঁচজনে নির্দিষ্ট করা হয়।