জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রয়াত মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর স্মরণসভায় ‘শোডাউন’ করেছেন তার উত্তরসূরী হতে আগ্রহী নেতারা। শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সভাপতিত্বে এই স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বক্তৃতায় জিয়াউদ্দিন বাবুলর জীবন কর্ম স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে যোগ্য ব্যক্তিকে মহাসচিব করার দাবি জানান। তাই শোক নয়, বরং স্মরণসভায় ছিল মহাসচিব বাছাইয়ের আবহ।

এ দিন মহাসচিব পদপ্রত্যাশী নেতাদের সমর্থকরা মিলনায়তনের বাইরে রাস্তায় স্লোগান দেন। মহাসচিব পদে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে- তাদের ঘিরে নেতাকর্মীদের জটলা ছিল। রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান দলের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলেন, জাপার সঙ্গে অতীতে বেইমানী করেছে- এমন কাউকে যেন মহাসচিব করা না হয়।

করোনা-পরবর্তী জটিলতায় গত শনিবার সকালে মারা যান জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। জাপা চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সূত্র সমকালকে বলেছে, তার স্মরণসভার অপেক্ষা ছিল। আগামীকাল শনিবার বা পরশু রোববার নতুন মহাসচিবের নাম ঘোষণা করতে পারেন জিএম কাদের।

কিন্তু কে হবেন সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাপার মহাসচিব? জিএম কাদের স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন, দলের অতিরিক্ত মহাসচিব তথা গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে তিনি মহাসচিব করার কথা চিন্তা করেছিলেন। তিনি সমকালকে একাধিকবার বলেছেন, শামীম বয়সে তরুণ, শিক্ষিত। বক্তৃতা ভালো করেন। তাই চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন, তকে মহাসচিব নিয়োগ করা যায় কি-না।

কিন্তু জিএম কাদেরের এমন সিদ্ধান্তে বাধা হয়েছেন জাপার জ্যেষ্ঠ নেতারা। গত বুধবার তারা বৈঠক করে জিএম কাদেরকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাদের ডিঙ্গিয়ে মাত্র সাত-আট বছর আগে দলে আসা ৪১ বছর বয়সী শামীম পাটোয়ারীকে মহাসচিব করা যাবে না। জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাউকেই এ পদে আনতে হবে। স্মরণসভায় কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, ‘পোড়খাওয়া, ত্যাগী নেতাকে মহাসচিব করতে হবে।’

বাবলা ছাড়াও জাপা তিন চার কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশিদ, মুজিবুল হক চুন্নু মহাসচিব পদ চান। সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা এবং অতিরিক্ত মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকাও এ পদের দাবিদার। তাদের সবাই যে যার মতো ‘লবিং’ করছেন। শুক্রবার এদের সবাই স্মরণসভায় ছিলেন।

জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার পর নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তিনি মহাসচিব পদে পাঁচবারের এমপি ও সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর নাম প্রস্তাব করেছেন দলের চেয়ারম্যানের কাছে। জাপার ছাত্র ও যুব সংগঠনের সাবেক সভাপতি বর্তমান অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার নামও রয়েছে আনিসুল ইসলামের প্রস্তাবে। এই দু'জনের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেবেন জিএম কাদের- এমন আলোচনা রয়েছে। তবে এখনও 'রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের' অনুমোদন প্রয়োজন বলে জাপা সূত্র জানিয়েছে।

রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া সমকালের কাছে স্বীকার করেছেন, তার ও মুজিবুল হক চুন্নুর নাম মহাসচিব পদে প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, কিন্তু মহাসচিব কে হবেন- তা একান্তই দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

শুক্রবার স্মরণসভায় মুজিবুল হক চুন্নুকে ঘিরে ছিল বেশি জটলা। বাবলুর জন্য দোয়া শেষে তিনি মঞ্চ থেকে নামার পর বিভিন্ন জেলার নেতারা তাকে ঘিরে ধরেন। তাকে আগাম অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন। গত বুধবার জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠক থেকে সবার পক্ষে মুজিবুল হক চুন্নুই টেলিফোন করেন জিএম কাদেরকে। জানিয়ে দেন, শামীম পাটোয়ারীকে মহাসচিব করলে জ্যেষ্ঠ নেতারা মানবেন না।

মহাসচিব পদে শামীমের নাম আলোচনায় থাকলেও কৌশলী জবাব দিয়েছেন বিচারক পদ থেকে রাজনীতিতে আসা মুজিবুল হক চুন্নু। সমকালকে তিনি বলেছেন, নতুন পদে তিনি প্রার্থী নন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জাপায় রয়েছেন। আটবার দলের মনোনয়নে নির্বাচন করেছেন। তাকে দল যদি মহাসচিব পদে দায়িত্ব দেয়, অবশ্যই তা যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করবেন।

স্মরণসভায় রহুল আমিন হাওলাদার ও মসিউর রহমান রাঙ্গা ঘোষণা দেন, তারা মহাসচিব হওয়ার দৌঁড়ে নেই। কিন্তু সমর্থকরা তাদের নামে স্লোগান তুলেছেন। মিলনায়তনের বাইরে হাজারখানেক সমর্থক জমায়েত হয়ে স্লোগান দেন ঢাকা-৪ আসনের এমপি আবু হোসেন বাবলার নামে। মুজিবুল হক চুন্নুকে ঘিরে নেতাকর্মীরা যখন শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন, তখন মিলনায়তন ত্যাগ করেন বাবলা।

জিএম কাদেরর সঙ্গে সভাস্থল ত্যাগ করেন আনিসুল ইসলাম। দলীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, জাপাতে বরাবর আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত এ নেতা পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন- তা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। সরকারের পছন্দ ও অপছন্দের দিকও তিনি দেখভাল করছেন। কিন্তু কে পরবর্তী মহাসচিব তা নিয়ে মন্তব্য করেননি।

এ দিকে স্মরণসভায় মঞ্চে দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন শামীম পাটোয়ারি। তাকে ঘিরে জটলা ছিল না।

জিএম কাদের স্মরণসভায় বলেন, মৃত্যুর পর মূল্যায়িত হচ্ছে জিয়াউদ্দিন বাবলু কতটা সফল মানুষ ছিলেন। তিনি জাপাকে শক্তিশালী করতে দিনরাত কাজ করেছেন। তা করতে গিয়েই জীবন দিয়েছেন। জাপাকে শক্তিশালী করতেই পারলেই জিয়াউদ্দিন বাবলুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।