নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের বিষয়ে 'আস্থা নেই' বিএনপির। তাই নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে রূপরেখা উপস্থাপন করবে দলটি। এজন্য নিজ দল, পেশাজীবী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।

দলটিতে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা রাখা কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে এখনই তারা সরব হবেন না। দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চান। ইতোমধ্যে দলের নেতা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এখন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। তাদের মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হবে।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার চাইলে বিএনপি আলোচনায় বসতে রাজি। তবে সেই আলোচনায় একটি মাত্র এজেন্ডা থাকতে হবে। সেটা হচ্ছে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। গত নির্বাচনের আগে যে আলোচনা হয়েছে, আর এখন যে আলোচনা হবে, তা এক নয়। আমরা একটা জিনিসই চাই তা হলো, নির্বাচনকালীন সময়ে একটা নিরপেক্ষ সরকার। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হবে। সংবিধানে ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা আছে। কিন্তু গত ৫০ বছরে এই আইন হয়নি। আইন না হওয়ায় নির্বাচন কমিশনার হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো মানদ নেই। রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়োগ দিয়ে আসছেন। ২০১২ সালে ইসি গঠনের আগে সার্চ কমিটি গঠনের প্রথা চালু হয়। সর্বশেষ দুটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল সার্চ কমিটির মাধ্যমে।

বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, আইন করে কিংবা সার্চ কমিটি গঠন করে 'নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন' গঠন করা সম্ভব নয়। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, সরকার তার আজ্ঞাবহদের দিয়ে কমিশন সাজাবে। বিগত দুটি নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারা বলছেন, এসব সার্চ কমিটিতে আওয়ামী লীগের সমর্থিতদের স্থান দেওয়া হয়। তাই সার্চ কমিটি গঠনের নামে তারা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদেরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ দেন। সেখানে বিরোধী দলগুলোর কোনো মতামতকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই এবার ওই পথে না যাওয়ার জন্য দলের কেন্দ্রীয় নেতারা মতামত দিয়েছেন।

বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়া যাবে না। সেখানে গিয়ে ফায়দা হয় না। নির্দিষ্ট রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

জাতীয় সংসদে আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়েও আশাবাদী হতে পারছে না দলটির নেতারা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সংসদে এ পর্যন্ত যেসব আইন তৈরি হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ যেভাবে চেয়েছে সেভাবে হয়েছে। এখানে বিরোধী দল বলতে জাতীয় সংসদে কিছু নেই। তাই নিজেদের সুবিধামতো আইন তৈরি করে সরকারের পছন্দমতো নির্বাচন কমিশন গঠন করবে।

এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, নির্বাচন কমিশন হচ্ছে একটা অঙ্গ আর পুরো শরীরটা হচ্ছে সরকার। শরীর ঠিক থাকলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে কাজ করে। কিন্তু এখানে সরকারই তো ঠিক নেই। এখানে যদি বিএনপির পাঁচজন স্থায়ী কমিটির সদস্যকে দিয়ে নির্বাচন কমিশনও গঠন করে তাতেও কোনো লাভ হবে না। কারণ, নির্বাচন সফল করার জন্য মূল উপসর্গ হচ্ছে প্রশাসন এবং আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যন্ত। সেটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে সরকার।

তিনি বলেন, আরেকটি আইন করা হয়েছে যে, একটি সংসদ বহাল রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে নির্বাচনের পর ৬০০ জনকে আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে পাচ্ছি। এই সিস্টেম থেকে আগে সরতে হবে, আগে সরকারকে সরাতে হবে। নির্বাচন কমিশন এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। সরকার যদি নিরপেক্ষ হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনে যারাই থাকুক তারা নিরপেক্ষ হয়ে যাবে। নিরপেক্ষ হতে বাধ্য করবে। এর পরও দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে দলের মতামত জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।

দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের দলের মতামত গ্রহণ করছি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতারা এ মতামত নিচ্ছেন। সেই প্রক্রিয়াটা এখনও চলমান রয়েছে। এর মধ্যেও বলতে পারি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া শুধু আইন করে কিংবা সার্চ কমিটি করে নির্বাচন কমিশন গঠন করে কোনো লাভ হবে না। কারণ, সার্চ কমিটি মানে হচ্ছে আওয়ামী কমিশন। এর পরও আমাদের ধারাবাহিক বৈঠকের পর দলের পক্ষ থেকে একটি মতামত জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।