ইউরোপের শিশুশিক্ষার ধরন আমাকে প্রথমে করেছে অবাক, পরে মুগ্ধ। জন্মের প্রথম বছর শিশু তার মায়ের সঙ্গে সময় কাটায়। পরে তাকে সুইডিশ ডাগিসে অর্থাৎ কিন্ডারগার্টেন বা ডে কেয়ার শিক্ষা প্রশিক্ষণে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মায়েরা শিশুর সঙ্গে থাকেন। আস্তে আস্তে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ও শিশুদের একটি সমন্বয় ঘটতে থাকে এবং মায়েদের উপস্থিতি কমতে থাকে এবং শেষে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় শিশুর শিক্ষা জীবন শুরু হয়।

শিশুর বয়স ছয় বছর হওয়া পর্যন্ত তাদের নানা বিষয়ের ওপর নানাভাবে হাতেনাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়। ছয় বছর তারা শেখে বিভিন্ন বিষয় যেমন- শেয়ার ভ্যালু, মনুষ্যত্ববোধ, ভাতৃত্ববোধ, একতা, সামাজিকতা। এক কথায় বলা যেতে পারে এখান থেকে জীবন গড়ার শুরুটাকে মজবুত করে তৈরি করতে সাহায্য করা হয়।

একজন শিশুর মধ্যে সচেতনতার ছাপ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি বার বার। দেখেছি যখন আমার ছেলেমেয়ে ডাগিস থেকে বাড়িতে এসেছে। আমি যদি কোথাও কোনো ভুল করেছি সঙ্গে সঙ্গে তারা বলেছে বাবা তুমি এটা এভাবে না করে এইভাবে কর।

আমাদের ডাগিসের শিক্ষকরা এটা এভাবে করতে বলেছেন। আমি অবাক হয়েছি আর তাদের থেকে নতুন নতুন বিষয় শিখেছি। শেখার সঙ্গে সঙ্গে তারাও বুঝেছে বাড়িতে এবং সমাজে তাদের ভ্যালু কত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ব্যক্তিত্ব এবং আত্মমর্যাদার বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয় ছয় বছর বয়সে। যা না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার কথা নয়।

ছয় বছর বয়সে কোনো রকম চাপ প্রয়োগ ছাড়া একজন শিশুকে গড়ে তোলা, যেখানে তার শিশুকাল হারিয়ে যায়নি, যেখানে সে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে জীবনের পরিকাঠামো তৈরিতে যা যা দরকার তার সব পেয়েছে। যার কারণে জীবনে চলার পথে দ্বন্দ্ব নয়, প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে সে নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে শুরু করে।

এবার স্কুলের জীবন শুরু। জীবনের নতুন অধ্যায়। জানা, দেখা, নিজের হাতে সব কিছু তৈরি করা। নিজের চেষ্টায় কিছু করা। দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা। নতুন এবং পুরোনোর সংমিশ্রণে চিন্তার উন্নয়ন করা। প্রকৃতিকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করা। অজানা এবং অচেনাকে চেনা। সব কিছুর সঙ্গে লতার মতো জড়িয়ে পড়া, যা এদের জীবনকে পরিপূর্ণতা দিতে সাহায্য করে।

ছয় বছর থেকে পনেরো বছর বয়সে এরা শিক্ষার বেসিকের সঙ্গে সুন্দরভাবে জড়িয়ে পড়ে। এ সময়ের শিক্ষায় জীবনের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ছবি দেয় বিধায় তারা বেশ সচেতন হয়ে ওঠে। তারা কী হতে চায় তাদের কর্মজীবনে।

সুইডেনে বাধ্যতামূলক শিক্ষার স্তর ৭-৮ বছরে শুরু হয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ৩টি স্তরে বিভক্ত। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিম্নস্তর, চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত মধ্যমস্তর এবং সপ্তম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চস্তর। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য স্কুল ও অভিভাবকের দায়িত্ব সমান। শিশুর উন্নতির ধারা এবং পছন্দ সম্পর্কে স্কুলগুলো নিয়মিতভাবে অভিভাবককে জানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের এমন ভাবে গড়ে তোলা হয় যেন তারা স্কুল ও স্কুলের বাইরের জীবন থেকে ভবিষ্যৎ শিক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। তারা যেন ভবিষ্যতে লিঙ্গ, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক কারণে পেশা বাছাইয়ের সময় কোনোরূপ সমস্যায় না পড়ে সে ব্যাপারে দৃষ্টি রাখা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার তিনটি স্তরে শিশুদের সুইডিশ ভাষা, গণিত, শারীরিক শিক্ষা, ইংরেজি, কারুকলা, সংগীত, ভিজ্যুয়াল আর্টস, প্রযুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা, ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্ম, ভূগোল এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতি মোট ১৬ বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয়।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা পছন্দসই একটি বিদেশি ভাষা পড়তে পারে। ফ্রেঞ্চ, জার্মান আর স্প্যানিশ ভাষার মধ্যে যে কোনো দুটি ভাষা স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য অফার করে থাকে। সময়ানুবর্তিতাকে এখানে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই ব্যাপারটি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়।

সুইডিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় গ্রেডিং মূলত তিন প্রকার। ফেইল, পাস এবং পাস উইথ ডিস্টিংশন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ- এই ছয়ভাবে গ্রেড করা হয়। তবে বি এবং ডি গ্রেডকে বলা হয় ফিলিং গ্রেড। পরীক্ষা হয় ২০ পয়েন্টের ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুরা অপশনাল বিষয়সহ মোট ১৭টি বিষয়ে সর্বোচ্চ ৩৪০ পয়েন্ট অর্জন করতে পারে। শিশুদের তৃতীয়, ষষ্ঠ এবং নবম শ্রেণিতে জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। সকল শিশুকে সমানভাবে মূল্যায়ন করাই এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য। তবে ষষ্ঠ শ্রেণির আগ পর্যন্ত শিশুদের গ্রেড করা হয় না। তৃতীয় শ্রেণিতে শুধু গণিত ও সুইডিশ ভাষার ওপর পরীক্ষা নেওয়া হয়। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে গণিত, সুইডিশ ভাষা এবং ইংরেজির ওপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা হয়। পাশাপাশি নবম শ্রেণিতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিদ্যার মধ্য থেকে যে কোনো একটি এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয় থেকে একটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়।

সুইডেনে দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক স্তরকে বলা হয় জিমনেশিয়াম বা হাইস্কুল। হাইস্কুলে লেখাপড়া করা সুইডেনের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে শতকরা ৯৮ ভাগ সুইডিশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায় শেষ করে হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে থাকে। এখানে হাইস্কুল স্তরে দুটি শাখা রয়েছে। প্রথম শাখাটি কারিগরি শিক্ষার ওপর নজর দেয় এবং অন্যটি উচ্চশিক্ষার ওপর। তবে উভয় শাখার শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পায়। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একই ধারার বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে এদেশে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং ডক্টরাল লেভেল রয়েছে। সকল ক্ষেত্রেই লেখাপড়ার জন্য এদেশে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিভার্সিটেট এবং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এই দুটি শাখা রয়েছে। ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রিসার্চ ওরিয়েন্টেড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজও রয়েছে এদেশে। সুইডেনে তিন বছরের স্নাতক, এক বা দুই বছরের স্নাতকোত্তর এবং দুই থেকে চার বছরের ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে সুইডিশ সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও অর্থায়ন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সুইডেনকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিশেষত ডক্টরাল পর্যায়ের গবেষণার জন্য সুইডিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আলাদা সুনাম রয়েছে।

সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে rahman.mridha@gmail.com