পুলিশের দু'জন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) একই মামলায় নিজেদের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেছেন। নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় করা আটটি মামলার বাকি পাঁচটির তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে গিয়ে জানা গেল, খোদ মামলাগুলো তদন্তের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মকর্তারা জানেন না, কোন মামলা তাদের তদন্তাধীন রয়েছে। তবে আটটি মামলার একটির চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ২০১৭ সালে। অন্য একটি মামলার তদন্তভার রয়েছে জেলা গোয়েন্দা শাখার হাতে। নাসিরনগরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় আট মামলার পাঁচ বছর পর তদন্তের এই অবস্থা। মামলার তদন্তের এই বেহাল দশার কথা শুনে হতাশ বাদীরা।

নাসিরনগরের চেঙ্গাপাড়ায় ছোট্ট লাল দাসের বাড়িতে আগুনের ঘটনায় করা মামলা সম্পর্কে জানতে প্রথমবার গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কথা হয় এসআই জুলফিকারের সঙ্গে। তিনি কোন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, সেটা নিজেই জানেন না। এরপর রাত পৌনে ১২টার দিকে কথা হয় এসআই মো. জুলুস খান পাঠানের সঙ্গে। তারও দাবি ছোট্ট লাল দাসের বাড়িতে আগুনের ঘটনার মামলাটি তদন্ত করছেন তিনি। এরপর আবার এসআই জুলফিকারের সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, ছোট্ট লাল দাসের বাড়িতে আগুনের ঘটনার মামলাটি তার তদন্তাধীর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'আমার আগে ছয়জন তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। তাই আমার কোন মামলাটি তদন্ত করার কথা, সেটা বলতে সমস্যা হয়েছে।'

ফেসবুকে কাবা শরিফ অবমাননার অভিযোগ তুলে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে ব্যাপক সহিংসতার পর ভুক্তভোগীরা চারটি এবং পুলিশ বাদী হয়ে আরও চারটি মামলা করে। ওই মামলাগুলোর একটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সারোয়ার হোসাইনের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে উল্টো সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান- তিনি কোন মামলার তদন্ত করছেন? কিছুক্ষণ পর তিনি থানায় গিয়ে মামলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পরামর্শ দেন।

এসআই হাবিবুর রহমান অন্য একটি মামলার তদন্ত করছেন। কোন মামলাটি তদন্ত করছেন- জানতে চাইলে তিনি 'এই যে উপজেলার আশপাশে, এই যে উপজেলার পশ্চিম দিকে, কী যেন' বলে আমতা আমতা করতে থাকেন। তিনি মামলাটির কত নম্বর তদন্ত কর্মকর্তা- জানতে চাইলে বলেন, 'আমার আগে তিনজন তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে।'

২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি থেকে কাবা শরিফকে ব্যঙ্গ করে একটি পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে ২৯ অক্টোবর রসরাজকে আটক করে তার বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা করে পুলিশ। রসরাজ তখন দাবি করেন, ওই পোস্ট তিনি দেননি। এর পরও রসরাজের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তার ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন মিছিল-মিটিং থেকে নাসিরনগর উপজেলার ১০টি মন্দির, শতাধিক ঘরবাড়িতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় দুস্কৃতকারীরা।

হামলার ঘটনায় পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তদের করা আটটি মামলায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আসামি করা হয়। তখন হামলার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখে ১২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে সবাই এখন জামিনে আছে।

ঘটনার ১৩ মাস পর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর গৌরমন্দির ভাঙচুর মামলায় পুলিশ নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম ও হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিসহ ২২৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ার প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও অনেক আসামি পলাতক থাকায় মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়নি। তবে ঘটনার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও বাকি মামলাগুলোর তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত সম্পর্কে কিছুই জানেন না ভুক্তভোগীরা।

উপজেলা সদরের দত্তপাড়ার দত্তবাড়ির পারিবারিক মন্দিরে হামলার ঘটনায় কাজল জ্যোতি দত্ত বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নাসিরনগর পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, একজন তদন্ত কর্মকর্তা কিছুদিন মামলার তদন্ত করার পর হঠাৎ করে বদলি হয়ে যান। তখন নতুন কর্মকর্তাকে আবারও তার নিজের মতো করে তদন্ত করতে হয়। যার ফলে কোনো কর্মকর্তাই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারছেন না। তবে মামলার তদন্তকাজ চলমান।

এই যখন পরিস্থিতি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর সহিংসতার চার্জশিটভুক্ত দুই আসামি আবুল হাশেম ও দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হয়। তবে দল বহিস্কৃত সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ আব্দুল আহাদকে ২০২১ সালে কৃষক লীগের আহ্বায়ক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে করা রসরাজ দাসের মামলা দীর্ঘ পাঁচ বছরেও তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় এ মামলার একমাত্র আসামি এবং নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনার অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী মামলার ঘানি টানতে টানতে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রসরাজের মামলায় আইনজীবী মো. নাসির জানান, দীর্ঘ পাঁচ বছরেও মামলার তদন্তকাজ শেষ না হওয়ায় দিন এনে দিনে খাওয়া রসরাজ চরম ভোগান্তির শিকার। এ ব্যাপারে রসরাজের মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক ইকবাল হোসেন বলেন, মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করি, শিগগিরই প্রতিবেদন দিতে পারব। ইকবাল হোসেন নিজেও বলতে পারেননি তিনি এ মামলার পঞ্চম নাকি ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা।