তৃণমূল থেকে বিএনপিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ থমকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্য ও ত্যাগীদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের হাতে নেতৃত্বভার তুলে দেওয়া হচ্ছে। যার সঙ্গে দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতারাও জড়িত বলে অভিযোগ উঠছে। হাইকমান্ডের কঠোর নজরদারির মধ্যেও পকেট কমিটি গঠনের বিস্তর অভিযোগ জমা পড়ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরে। অভিযোগ উঠেছে, কমিটি গঠনে অনেক ক্ষেত্রে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী 'এক নেতার এক পদ' নীতি বাস্তবায়ন করা হয়নি, সাবেক ছাত্রনেতাসহ ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলকে সুসংগঠিত করতে বিএনপিসহ সব অঙ্গসংগঠনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পৃথকভাবে সারাদেশে সাংগঠনিক টিম গঠন করে এসব অঙ্গসংগঠনের মহানগর, থানা, পৌর কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন তিনি। তৃণমূলের ও রাজপথের ত্যাগী ও যোগ্যদের তিনি নেতৃত্বে তুলে আনার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, একদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সাবেক এমপি কিংবা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পছন্দের নেতাদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটিতে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে সাংগঠনিক টিমের নেতারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অযোগ্যদের সামনে আনছেন। শুধু অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ভাগ্যেই পদ বঞ্চনার ঘটনা ঘটছে না- মূল দলেও ঘটছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাংগঠনিক টিমের নেতারা বিষয়টিকে 'দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা রয়েছে' বলে এড়িয়ে যাওয়ার কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এসব অভিযোগ এড়িয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতাও অনেক। এই দলে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের আধিক্যও বেশি। কিন্তু কমিটিতে তো সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়।

কেন্দ্র বরাবর অনিয়মের এমন একটি অভিযোগ করেছেন পটুয়াখালীর গলাচিপা থানা বিএনপির নেতাকর্মীরা। থানা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান খান, সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৩০ নেতা এতে স্বাক্ষর করেছেন। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকায় অবস্থানকারী কেন্দ্রীয় একজন নেতা গলাচিপা-দশমিনা বিএনপির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি আওয়ামী ঘরানার নেতাদের দিয়ে গলাচিপা ও দশমিনা থানা বিএনপি কমিটি গঠনের পাঁয়তারা করছেন। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস  জাহান শিরীনকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

বিএনপির অন্যতম অঙ্গসংগঠন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়ে গঠিত ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের বিরুদ্ধেই বেশি অভিযোগ এনেছেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা বিভাগীয় টিমের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ। যুবদলের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট বিভাগীয় টিমের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

প্রসঙ্গত বিএনপির সাংগঠনিক টিমের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে সরেজমিন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা ও পৌর কমিটির সাংগঠনিক প্রতিবেদন তৈরি করার। এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের আগে সংশ্নিষ্ট জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করা হচ্ছে। অনিয়মকে বাস্তবায়ন করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নামও যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে যে, যুবদলের ঢাকা বিভাগীয় টিম শিল্প এলাকা গাজীপুরের শ্রীপুর কমিটি গঠনে মোটা অঙ্কের লেনদেন করেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতকে উপেক্ষা করে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সেখানে যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে আহ্বায়ক করা হয়েছে আতাউর রহমান মোল্লাকে। যিনি গাজীপুর জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক। গুরুত্বপূর্ণ এমন পদে থাকার পরও তাকে থানা যুবদলের আহ্বায়ক করায় বিস্মিত নেতাকর্মীরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুবদলে আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষিত আতাউর রহমান মোল্লা পরিবারসহ ঢাকায় বসবাস করেন। শ্রীপুর থানা বিএনপির কোনো কার্যক্রমেও তিনি অতীতে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ঘোষিত কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের মাইদুল ইসলাম সজীবকে। যিনি এর আগে ইউনিয়ন কিংবা থানা ছাত্রদল কিংবা যুবদলের কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। অন্যদিকে, ৩৭টি মামলা ও সাতবার কারাগারে যাওয়ার পরও থানা যুবদলে পদপ্রত্যাশী আরিফুল ইসলামের ভাগ্যে পদ জোটেনি। একইভাবে পদায়ন ঘটেনি লিয়াকত আলী, নজরুল ইসলাম ও রাকিব আকন্দের ভাগ্যে।

এসব বিষয়ে টিম প্রধান জাকির হোসেন নান্নু বলেন, গাজীপুরের শ্রীপুরে কমিটি গঠনে কেন্দ্রীয় যুবদলের হস্তক্ষেপ ছিল। তারা এ কমিটি গঠন করেননি। এদিকে, একই টিমের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানা কমিটি গঠনেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিভাগীয় টিমের পাশাপাশি ময়মনসিংহ বিভাগীয় টিমের বিরুদ্ধেও রয়েছে যুবদল কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিস্তর অভিযোগ। মুক্তাগাছা থানা যুবদল কমিটি গঠনে নিষ্ফ্ক্রিয় আর অযোগ্যদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সক্রিয়দের বিরুদ্ধে তারেক রহমানের কাছে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে। যদিও পরে কেন্দ্রীয় যুবদলের হস্তক্ষেপে যোগ্যদের কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সিলেট, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের বিরুদ্ধেও। ঢাকা, ময়মনসিংহসহ আরও কয়েকটি বিভাগীয় টিমের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ।

এসব বিষয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল আলম নীরব বলেন, কাজ করলে অভিযোগ আসবেই। যিনি কাজ করেন না, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। সংগঠন করতে গিয়ে সবার মন জোগাড় করা সম্ভব নয়। অনেকে নেতৃত্ব থেকে ছিটকে গিয়ে এসব অপপ্রচার করেন। যেসব অভিযোগের কথা উঠেছে বা শুনতে পাচ্ছি, তা সত্য নয়।