মন্ত্রী, এমপি ও জেলা নেতাদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কর্মশালায় বলা হয়েছে, দলের বিরুদ্ধে ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত থাকতে হবে। নিজেদের শোধরাতে হবে। না হলে সামনে বিপদ আছে। অপকর্ম করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকেও শাস্তি পেতে হয়েছে। সবাইকে সাবধান হতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের শুধরে নেওয়ার তাগিদ দিয়ে বলা হয়, 'জনগণের আস্থা হারালে মূল্য দিতে হবে।'
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে ১৩ জন কেন্দ্রীয় নেতা, চারজন মন্ত্রী, চট্টগ্রাম বিভাগের ১৫টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, আহ্বায়ক, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের ৪৫ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় মন্ত্রী, এমপি ও জেলা পর্যায়ের নীতিনির্ধারক নেতারা খোলামেলা কথা বলেছেন। কয়েকটি এলাকায় কয়েকজন বিপথগামী নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানও দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি পরামর্শও এসেছে। তবে সাংগঠনিক বিষয়াদি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে কর্মশালায়। এতে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগকে আরও সংগঠিত করার অংশ হিসেবে বিশদ কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কর্মশালায় কমবেশি সবার কণ্ঠেই তৃণমূল পর্যায়ে বিরাজমান দ্বন্দ্ব-বিবাদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি উচ্চারিত হয়েছে। মন্ত্রী, এমপি ও জেলা নেতারা বলেছেন, জনমুখী কর্মকাণ্ডে আরও সম্পৃক্ত হতে হবে। এখন থেকেই পুরোদমে আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। এর আগে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে গুছিয়ে নেওয়ার তাগিদও দেওয়া হয়েছে। কর্মশালায় বিএনপির সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়েও কথা হয়েছে।
'আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি' শীর্ষক এই কর্মশালায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এমন কর্মশালা আয়োজনের বিষয়টি একেবারেই ব্যতিক্রমী হয়েছে। এতে সাংগঠনিকভাবে বেশ কার্যকর সফলতা পাওয়া যাবে। দলের নেতাকর্মীরাও উদ্দীপ্ত হবেন। বিশেষ করে দলের এমপি এবং সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন সবক'টি উপজেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে দু'দিনব্যাপী আরেকটি কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগীয় কর্মশালা আয়োজনের চিন্তা করছেন দলের সংশ্নিষ্ট যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফের সভাপতিত্বে গতকালের কর্মশালা উদ্বোধন করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধান অতিথি ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের পরিচালনায় এই কর্মশালায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ওয়াসিকা আয়েশা খান, কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন এবং কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য দীপংকর তালুকদার।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কর্মশালায় উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছেন, আওয়ামী লীগে সুবিধাবাদীদের কোনো স্থান নেই। আর তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগের প্রাণ। তাই সৎ, দক্ষ এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেন এমন পরিচ্ছন্ন নেতাদের সংগঠনের দায়িত্ব দিতে হবে। সংগঠনকে সংগঠিত করতে বঙ্গবন্ধু যেভাবে কাজ করতেন, নেতাকর্মীদের সেই আদর্শ ধারণ করে কাজ করতে হবে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের প্রসঙ্গ নিয়ে কর্মশালায় আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে খুবই কঠোর। সর্বশেষ গাজীপুরের মেয়রই এর প্রমাণ। সুতরাং সাবধান। এ বিষয়ে আলোচনার সময় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টি উঠে আসে। এ সময় বলা হয়, দলের কেউ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই দলের ক্ষতি করতে দেওয়া হবে না।
প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টার এই কর্মশালায় গাজীপুরের মেয়রের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কয়েকজন নেতা বলেছেন, অপরাধের দায়ে দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক শাস্তি পেয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদাহরণ। কিন্তু নোয়াখালীর একজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ অকারণে দলের সমালোচনা এখনও অব্যাহত রেখেছেন। তিনি দলের শীর্ষ পর্যায়ের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন। তার এসব কর্মকাণ্ড দলীয়ভাবে অবশ্যই শৃঙ্খলা পরিপন্থি। সুতরাং ওই নেতাকেও দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা উচিত।
কর্মশালায় আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দেশজুড়ে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করছে; কিন্তু এর তেমন একটা ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য দলের একশ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মী দায়ী। তাই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে উন্নয়নের সুফল আগামী নির্বাচনেও পাওয়া যাবে। তবে এখন থেকেই মানুষের কাছে যেতে হবে। মানুষের প্রতি সর্বোচ্চ বিনয় দেখাতে হবে। জনকল্যাণমুখী কাজ করতে হবে। দাম্ভিকতা পরিহার করতে হবে। কিছুতেই অহংকার করা যাবে না।
কর্মশালায় সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কয়েকটি জেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা, হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডব এবং বাংলাদেশে সফররত পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের অনুশীলনে পাকিস্তানের পতাকা টানানো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারাটা আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা। তবে আওয়ামী লীগই সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাকে উস্কানি দিয়েছে। আর হেফাজতে ইসলামের অনুসারীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও তাদের দোসররাই পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের অনুশীলনে পাকিস্তানের পতাকা টানিয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে তার চিকিৎসা প্রসঙ্গে বিএনপির দাবির বিষয়ে কর্মশালায় বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে বর্তমান সরকার বেশ আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও এ বিষয়ে মানবতা দেখিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতাবলে বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারামুক্তি দিয়ে বাসায় থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আইনের বাইরে গিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।