বিভক্ত গণফোরামকে ঐক্যবদ্ধ করতে আবারো উদ্যোগ নিয়েছেন উভয়পক্ষের সিনিয়র নেতারা। শুক্রবার একাংশের কাউন্সিল ঘিরে দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুই পক্ষই নমনীয় মনোভাব পোষণ করছেন। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তারা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গেছে।

রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সকাল ১০টায় গণফোরামের মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন অংশের জাতীয় কাউন্সিল শুরু হয়। 'দুঃশাসন হটিয়ে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার' স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত সম্মেলনের প্রথমার্ধে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন। দ্বিতীয়ার্ধে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে ১৫৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মোস্তফা মোহসীন মন্টু এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর নাম ঘোষণা করা হয়।

গণফোরামের একাংশ আয়োজিত জাতীয় কাউন্সিলকে শুভকামনা জানিয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য সম্মেলনে অংশ নিতে না পারলেও চিঠিতে ড. কামাল আশাবাদ ব্যক্ত করেন, গণফোরামের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কাজ করবেন। এই সম্মেলনের পর মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও গণফোরামের আরেক অংশের নেতা মোকাব্বির হোসেনকে আলোচনার মাধ্যমে গণফোরামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য আরেক চিঠিতে আহ্বান জানান ড. কামাল। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, 'আমি আশা করি, গণফোরাম যে নীতি ও আদর্শ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, আপনারা গণফোরামের সব নেতা সম্মিলিতভাবে হাতে হাত রেখে সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করবেন।'

ড. কামাল হোসেনের এই দুই চিঠিকে উভয় অংশের নেতারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জানান।

গণফোরামের কাউন্সিল উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিনিধি দলকে দেখা যায়নি। বিএনপির পক্ষে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী ও আব্দুস সালাম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য দেন। এতে প্রত্যেক বক্তা রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থা গুরুতর। কখন কি হয় বলা যায় না, আমরা কেউ জানি না। তার জামিনের ব্যবস্থা না হলে সবার কপালে দুঃখ আছে।

বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি তাদের একটি অনুরোধ করেছি। তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে আমি কোনো কথা বলছি না। আজ তারেকের উচিত- প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ফোন করে বলা, মায়ের জীবন বাঁচান।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক বন্ধু ছিলেন উল্লেখ করে ড. জাফরুল্লাহ বলেন, তার ছেলে আজকের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এই মন্ত্রীরও বিচার হবে। এ সময়ে তিনি বিচারপতিদেরও সমালোচনা করেন। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুখে মুখে জাতীয় ঐক্যের কথা বললে চলবে না, তাগিদ দিতে হবে। সবাই মিলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

আ স ম আবদুর রব বলেন, খালেদা জিয়ার কিছু হলে দেশে কী ঘটবে তা মনে করলেও গা শিউরে ওঠে। তাকে বিদেশে যেতে দিন। এই সরকারকে সরাতে গণঅভ্যুত্থান, গণ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নাই। সবাইকে মাঠে নামতে হবে। এই সরকারকে বিদায় করতে হবে।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তিনি ক্ষমতায় থাকার অধিকার হারিয়েছেন। খালেদা জিয়া সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি একমত। তবে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না। তার ওই বক্তব্যে তিনি শপথভঙ্গ করেছেন। এ কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকতে পারেন না।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুসজ্জায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, আপনি তাকে বিদেশ যেতে দিচ্ছেন না কীসের ভয়ে? একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে আজই তাকে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে এখন একটা দুঃশাসন চলছে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রিয় একজন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। তাকে দ্রুত বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো খুব জরুরি। এই সরকার খুবই অমানবিক, তারা তাকে বিদেশ পাঠাবে না।

পরে বিকেল ৩টায় কাউন্সিল অধিবেশন ফজলুল হক সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে উত্থাপিত সাংগঠনিক প্রস্তাব, রাজনৈতিক প্রস্তাব ও অর্থবিষয়ক প্রস্তাবের ওপর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নেতারা আলোচনা করেন। নির্বাচনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ।

ঘোষিত কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও ৭ সদস্যের নির্বাহী পরিষদ, ২০ সদস্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ২৮ সদস্যের সম্পাদকমণ্ডলী ও ৮৮ জনকে সদস্য করা হয়েছে।