ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

হলফনামার তথ্যে গরমিল, যাচাই করবে কে

হলফনামার তথ্যে গরমিল, যাচাই করবে কে

.

 মসিউর রহমান খান 

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৩৫ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১১:১২

হলফনামায় প্রার্থীদের সম্পদের হিসাবে অসংগতি ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেক প্রার্থীর নিজের নামে সম্পদ দেড় থেকে দ্বিগুণ বাড়লেও স্ত্রীর নামে সম্পদ বেড়েছে ৫০ থেকে ৬০ গুণ। অনেকে আবার হলফনামায় আয় কমিয়ে দেখালেও সম্পদ বেড়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। 

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও) অনুযায়ী হলফনামায় ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পরও প্রার্থী সদস্যপদ হারাবেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের এত জনবল নেই যে, সব প্রার্থীর হলফনামা যাচাই করবে বা খতিয়ে দেখবে। সাধারণত রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র বাছাইকালে হলফনামায় আট ধরনের তথ্য না দিলে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। কিন্তু অসংগতি যাচাই করা হয় না। গত দুই জাতীয় নির্বাচনে এসব বিষয় আমলে নেওয়া হয়নি। অনেক প্রার্থী আট ধরনের তথ্যও পূরণ করেননি। 
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির আয় কমে গেলে তাঁর সম্পদ কীভাবে বাড়ে? এমন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। অবশ্যই তথ্য যাচাই করা উচিত। অতীতে হলফনামা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আচরণ স্বচ্ছ ছিল না। এগুলো সরবরাহ করার ক্ষেত্রেও তারা লুকোচুরি করেছে। দশম সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগে ক্ষমতাসীন দলের আপত্তির কারণে হলফনামার তথ্য প্রকাশ না করতে ইসির ওয়েবসাইট ডাউন করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর হলফনামা জমা দেওয়ার নিয়ম কার্যকর হয় ২০০৮ সাল থেকে। যার মধ্যে প্রার্থীর আয়-ব্যয়, সম্পদের হিসাব, তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয়, সম্পদের হিসাব সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আট ধরনের তথ্য হলফনামার মাধ্যমে জমা দেওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে আদালতের রায়ের আলোকে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ নিয়ে অতীতে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের উচ্চপদস্থরা আড়ালে থেকে এই রায় আটকানোর অপতৎপরতা চালিয়েছিলেন। তিনি বলেন, হলফনামার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ঠেকানো। শুরু থেকে এ বিষয়ে সব পক্ষ সোচ্চার হলে নির্বাচনী অনিয়ম অনেক কমানো সম্ভব হতো। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার দিনবদলের সনদে পাঁচটি বিষয়ে অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে গিয়ে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।’ কিন্তু পাঁচ বছর পরে ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়ার বিধানের সমালোচনা করে বলেন, ‘এই হলফনামা এখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনননামায় পরিণত হয়েছে।’ ইসিতে হলফনামা জমা দেওয়ার আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার কথাও বলেন তিনি। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আর কোনো ঘোষণা আসেনি।  

তবে গতকাল শনিবার সমকালের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটির আহ্বায়ক ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিশ্বের সব দেশেই সম্পদের হিসাব আয়কর রিটার্নে জমা দেওয়া হয়। কেউ প্রকৃত তথ্য গোপন করলে আয়কর আইনে তাঁর শাস্তি হবে। তারপরও মনোনয়নপত্রে হলফনামার মাধ্যমে সম্পদের হিসাব পৃথকভাবে জমা নেওয়ার পদ্ধতি চালু থাকা খারাপ কিছু নয়। এতে তিনি কোনো সমস্যাও দেখছেন না।

নবম সংসদের ভোটের আগে দিনবদলের সনদের অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নীতিগতভাবে তাঁর দল ওই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। তবে এবারের ইশতেহারে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা থাকছে না বলে জানান কৃষিমন্ত্রী ড. রাজ্জাক। কোন প্রার্থীর হলফনামায় ভুল তথ্য বা অঙ্গতিপূর্ণ কিছু থাকলে সাধারণ ভোটাররা বিবেচনা করে ব্যালটের মাধ্যমে রায় দেবেন বলে মন্তব্য করেন ক্ষমতাসীন দলের এ নীতিনির্ধারক।     

ইসি-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কারণে অতীতে ফরিদপুরে প্রার্থী কাজী সিরাজ এবং বগুড়ার মোহাম্মদ শোকরানাসহ অনেকের প্রার্থিতা বাতিলের নজির রয়েছে। দশম সংসদ ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় তথ্যের গরমিল নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও কোনো পক্ষেরই তেমন তৎপরতা চোখে পড়েনি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঝেমধ্যে এ নিয়ে কথা বললেও বিশেষ উদ্যোগ দেখা যায়নি। হলফনামা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকেও একই আচরণ করতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হলফনামার তথ্য শুধু প্রার্থীদের বিষয়ে ভোটারদের ধারণা দেওয়া নয়, আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। প্রার্থীর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ থাকলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসতে পারে। কারও অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে স্বপ্রণোদিতভাবে নিজেদের ক্ষমতাবলেই এই কাজগুলো দুদক করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাগুলোও এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দেখতে পারে যে কর ফাঁকির কোনো বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত কিনা। বিশেষ করে, তাদের আয়কর বিবরণীর সঙ্গে এসব সম্পদের মিল আছে কিনা, সেটা যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রক্রিয়াগুলো আসলে হয় না, কারণ যাদের সম্পর্কে এই অভিযোগগুলো আসছে, তারা ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে হাত দিলে হাত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে অনেকে মনে করেন। এ কারণেই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।  

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, আয়কর রিটার্নে যে সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়, সেটাই নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থী হলফনামায় সম্পদের বিবরণীতে উল্লেখ করেন। তবে অনেক সময় কিছু প্রার্থী নানা কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে দুই জায়গায় সম্পদের দুই রকম হিসাব দেন; যা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ইসি কোনো প্রার্থীর সম্পদ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে হিসাবের তথ্যে গরমিল দেখা গেলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। তাছাড়া কোনো প্রার্থী যদি হলফনামায় অধিক সম্পদ দেখায় তাহলেও এনবিআর বাড়তি সম্পদের কর আদায়ে পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বরাবরের মতো এবারও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত এনবিআরের বাড়তি কোনো উদ্যোগ নেই বলেও জানান তিনি।   

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার ২ হাজার ৭১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে ৭৩১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে এর মধ্যে হলফনামায় তথ্য গরমিলের কারণে কারও মনোনয়নপত্র বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, ‘ইসির এত জনবল নেই যে কয়েক হাজার হলফনামা যাচাই করে দেখবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় কেউ চ্যালেঞ্জ করলে ইসি তা যাচাই করে দেখে। যাচাইয়ে যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এই ক্ষমতা ইসির আছে।’

এদিকে গতকাল শনিবার হলফনামায় মামলার তথ্য গোপন করার অভিযোগ তুলে ঝালকাঠি-১ আসনে সদ্য বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়া শাহজাহান ওমরের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে আপিল করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির। তিনি জানান, মামলার তথ্য গোপন করার জন্য তাঁর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আপিল করা হয়েছে। সংক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আপিলটি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব জাহাংগীর আলম বলেন, ‘হলফনামা তদন্ত বা কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব ইসির নয়। প্রার্থীদের কাছ থেকে হলফনামা সংগ্রহ করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা ইসির দায়িত্ব।’ ১৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পরে প্রার্থীদের সবার হলফনামা অনলাইনে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ইসির আইন শাখার কর্মকর্তারা জানান, আরপিও অনুসারে হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থী তথ্য না দিলে বা দাখিল করা হলফনামায় কোনো অসত্য তথ্য দিলে বা হলফনামায় কোনো তথ্যের সমর্থনে সার্টিফিকেট, দলিল দাখিল না করলে রিটার্নিং অফিসার নিজ উদ্যোগ অথবা কোনো ব্যক্তির উত্থাপিত আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্ত তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন এবং কোনো মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারবেন। এ ছাড়া হলফনামা দাখিল না করলে বা আদেশের বিধানাবলি যথাযথভাবে প্রতিপালন না করলে ইসি বাছাই পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। তাছাড়া হলফনামায় প্রদত্ত কোনো তথ্য মিথ্যা বা ভুল প্রমাণিত হলে তা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

সুজনের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচন অংশ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ৪৮ জন প্রার্থীর ২০০৮ সালের হলফনামা ও ২০১৪ সালের হলফনামা পর্যালোচনা করেছিল। তখন প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, বেশ কয়েকজন প্রার্থীর আয় ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৮ হাজার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এতে অংশ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ৫৩ জন প্রার্থী, যারা দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের হলফনামার আয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে সুজন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সর্বমোট ৫৩ জন প্রার্থীর আয় গড়ে ১০৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আয় বৃদ্ধির এই হার ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১১৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

আরও পড়ুন

×