নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠেছে। এতদিন নির্বাচন নিয়ে চুপ থাকলেও সোমবার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তিনি যে ভাষায় কথা বলছেন তা আচরণবিধি লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। 

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিদের নির্বাচনী প্রচার বা নির্বাচনী কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান নিজেও বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। 

শামীম ওসমানের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, স্থানীয় এমপি রাজনৈতিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করলেও তিনি নির্বাচন নিয়ে বেশকিছু মন্তব্য করেছেন। এতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। তাই এটা আচরণবিধি লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। 

যদিও এ বিষয়ে রির্টার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। তবে ইসি সূত্রগুলো বলছে, কেউ এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। 

সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান এমপিদের ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধার কথা তুলে ধরে বলেন, অনেকে নৌকা নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ নৌকার ঘাঁটি, আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, শেখ হাসিনার ঘাঁটি। এখানে অন্য কোনো খেলা খেলার চেষ্টা করবেন না।

বিধি ভেঙে দলীয় প্রতীকে ভোট চাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, এতদিন প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিলেও নৌকার পক্ষে আড়ালে থেকে কাজ করছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে সব সত্য বলতে পারছেন না। চুপ থাকার কারণে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা তৈরি হয়েছে। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেউ উল্টোপথে হেঁটে দলের ক্ষতি করছেন। আবার কেউ দলের সঙ্গে হেঁটে দলের ক্ষতি করছেন। তবে তারা কারা তা স্পষ্ট করেননি শামীম ওসমান। 

সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীরা নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। বিধিমালায় সাংসদদের সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা আছে, যে কারণে তারা স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনের প্রচার বা নির্বাচনী কাজে অংশ নিতে পারেন না। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের শাস্তি ৬ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া শামীম ওসমান দলীয় নেতা–কর্মীদের নৌকার পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন,  ‘কে প্রার্থী, হু কেয়ার? কলাগাছ না আমগাছ, সেটা দেখার বিষয় না। আমাদের দেখার বিষয় একটাই, এইটা আমার স্বাধীনতার নৌকা, এইটা আমার জাতির পিতার নৌকা, এইটা আমার শেখ হাসিনার নৌকা, এইটা আমার বঙ্গবন্ধু পরিবারের নৌকা, এইটা আমাদের রক্ত দিয়ে গড়া নৌকা। এই নৌকার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।’

শামীম ওসমান এই নির্বাচনে আইভীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমুর আলমের প্রতীক ‘হাতি’ নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, ‘হাতির বড়জোর সাইজ বড় হতে পারে, হাতির সাইজ বড় হইলে আমরা কান্ধে নিয়ে দৌড় দিব ইনশা আল্লাহ। কিন্তু নৌকার ওপর উঠতে দিব না।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনও মনে করেন, নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। শামীম ওসমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। যদিও তিনি মনে করেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীকে হওয়ার কারণে দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে অংশ নিতে না দেওয়ার বিধি অযৌক্তিক। এটি পরিবর্তন করা দরকার। এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হতো না। তখন এই বিধি যৌক্তিক ছিল।