জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন করছেন, তখন ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের একাংশ ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ৭২ সালে .. তারপর থেকে শুরু হল কিছু কিছু লোকের নানা ধরণের সমালোচনা। এটা হল না, ওটা হল না, এটা হচ্ছে না, ওটা হচ্ছে না।  ভেবে দেখুন, দেশটা ছিল পরাধীন। ২০০ বছর ধরে তারা ব্রিটিশের গোলামি করেছে। ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানের গোলামি করতে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে... ২৪ বছরের যন্ত্রণা....। সেই পাকিস্তানের প্রদেশ থেকে রাষ্ট্রে উন্নীত করেছেন। ধীরে ধীরে সে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাকে সময় দেওয়া হল না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা সে সময়ে এরকম কলাম লিখেছেন বা আন্দোলনের নামে এ ধরণের পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তারা কী ভেবেছিল? কী করতে চেয়েছিল তারা? সেটাই আমার প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর আমি এখনও পাই না।’

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সংযুক্ত হন। 

১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র তথা শ্রেণিহীন শোষণহীন কৃষক শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ২৩৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫টি আসনে বিজয়ী হয় দলটি ।

১৯৭৪ সালের শুরু থেকে শেখ মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, শেখ মুজিব সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে জাসদ পটভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

অবশ্য নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নানা পটপরিবর্তনে সেই জাসদই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে যোগ দেয়। পরে মহাজোট সরকারের মন্ত্রীত্ব পান দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ১৪ দলের সঙ্গেই জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে দলটি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক দিনটির প্রেক্ষাপট স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু মাথা নত করেননি। বাঙালি জাতির সম্মান তার কাছে ছিল বড়। মানুষের জন্য, এ দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে আত্মোৎসর্গ করেছেন তিনি।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর নানা অবদানের কথাও তিনি তুলে ধরেন এদিন।

তিনি বলেন, ‘সত্যিই তিনি পরিবর্তন শুরু করেছিলেন। হাতে সময় ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। একটা ‍যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায় করে দিয়েছিলেন।’

বাংলাদেশের তৃণমূলের মানুষকে প্রাধান্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাদের হাতেই ক্ষমতা তুলে দিতে চেয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘ঔপনিবেশিক ও আধা ঔপনিবেশিক শাসনামলের যে সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সে ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ, তৃণমূলকে মানুষগুলির হাতে ক্ষমতার অধিকার দিতে চেয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের মধ্যে তিনি যে সংবিধান দিয়েছিলেন, সেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক হবে জনগণ। সেই পদক্ষেপই তিনি নিয়েছিলেন।’ 

উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচনী ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষ যেন সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে। তারা যেন পরনির্ভরশীল না হয়, তারা যেন আত্মমর্যাদাশীল-আত্মনির্ভরশীল হয়। তিনি ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ বিনির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।’

পঁচাত্তরের পনের আগস্টের শোকাবহ স্মৃতি স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু তনয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটি তো অনেক উর্বর। এখানে যেমন ভালো মানুষ জন্মে, আবার অনেক পরগাছাও জন্মে। তেমনি বেঈমান, পরগাছাও এ দেশে ছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল, এ দেশ যেন আর উন্নতি করতে না পারে। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ নিয়েছিল তারা।’