পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে শান্তি চুক্তির দুই দশকে পেরিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়ন কতটা হয়েছে তা ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং। 

তারা বলেছেন, সংঘাত-সংঘর্ষ ছেড়ে সরকার ও স্থানীয়দের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলের ধারাবাহিক উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। আর যারা শান্তি ফেরাতে বিরোধিতা করছে, চাঁদাবাজি করছে, তাদের স্বার্থ কি সেটাও দেখতে হবে।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ভোরের কাগজ ও আইসিএলডিএস যৌথ উদ্যোগে ‘সম্প্রীতি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন: একুশ শতকে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। আইসিএলডিএস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জমিরের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইসিএলডিএস নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল অব. মো. আবদুর রশীদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ভোরের কাগজ সম্পাদক এবং আইসিএলডিএস এর পরিচালক শ্যামল দত্ত। 

বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং, সংসদ সদস্য আরমা দত্ত, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, আইসিএলডিসির ভাইস চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) এম আসহাব উদদীন এনডিসি, মেজর জেনারেল (অব.) আলাউদ্দিন এম. এ. ওয়াদুদ বীর প্রতীক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব আনাম খান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাইদুর রশিদ সুমন, অ্যাডভোকেট ইকবাল করিম, আমেরিকান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নূসরাত ফিরোজ আমান, ব্যরিস্টার মিতি সানজানা, ব্যারিস্টার তাসমিয়া নাহিয়া আহমেদ, এক্টিভিস্ট অনন্ত ধামাই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম, এফবিসিসিআই পরিচালক ফারাহ্‌ মাহমুদ তৃণা ও বান্দরবন উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যাশৈহ্লা মারমা প্রমুখ।

পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান প্রথম থেকেই পরিস্কার। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলের ধারাবাহিক উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রধান সমস্যা ভূমিবিরোধ সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে যে প্রকল্পগুলো আসছে সেগুলো তড়িৎ গতিতে পাশ হওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট ও আওয়ামী লীগ সরকার দৃশ্যমান উন্নয়ন করতে সমন্বিতভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অচিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নের দিক থেকে সমৃদ্ধি ও শান্তিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে বলছেন, শরণার্থী হওয়ার পর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেকে নিজেদের বসতভিটা ফিরে পাননি। শান্তি ফিরে আসতে এই ভূমি বিরোধ অনেক বড় একটি সমস্যা। এটিকে ভয়ংকর ও স্পর্শকাতর দিক বিবেচনা করে ভূমি কমিশনকে কাজ করতে হবে।’ 

তিনি পার্বত্য এলাকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের দিকটিতে গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘অন্য আরেকটি দিক হচ্ছে, উন্নয়নের ভূমিকা কি? আমাদের ধারণা, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে উন্নয়নের বেশকিছু পজিটিভ দিক রয়েছে। তবে, উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে কি না। যারা সবচেয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ আছে, তাদের উন্নয়ন হচ্ছে কি না দেখতে হবে। আর যারা শান্তি ফেরাতে বিরোধিতা করছে, চাঁদাবাজি করছে, তাদের স্বার্থ কি সেটাও দেখতে হবে। অনেকে নিম্ন আয়ের মানুষদের সামনে এনে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে, এ বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, ‘বন্দুক দিয়ে যে সমস্যার সমাধান করা যায়নি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তা সমাধান করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। শান্তিচুক্তির আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কি উন্নয়ন হয়েছিল আর এখন কতটা উন্নয়ন হয়েছে সেটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আজ এই এলাকায় স্কুল-কলেজ রাস্তঘাট হাসপাতাল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ হয়েছে তা শান্তিচুক্তির ফসল। চুক্তি না হলে এগুলো কখনোই সম্ভব ছিল না। এই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা কেন। বিশ্ববিদ্যালয় করার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হচ্ছে- এই ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

আরমা দত্ত বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সরকারের উচিত, ২০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আগানো।’

আইসিএলডিসির আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বর্তমান সরকারের এক যুগে যে অবাবনীয় উন্নয়ন পার্বত্য চট্টগ্রামে হয়েছে, তাতে অবহেলিত অঞ্চলগুলোও সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, উন্নয়ন করতে চাইলে শান্তি সম্পৃতি সৌহার্দ্য নিশ্চিত করতে হবে।’

মেজর জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রশীদ বলেন, ‘শান্তির বার্তা নিয়ে দুই যুগ আগে চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তির ফলে শান্তি ফিরে এসেছে। তবে আরও শান্তির জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। তবে আগে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে আর এখন স্থানীয়দের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই আছে। এসকল সমস্যার কারণ নির্ধারণ করে অধিকতর শান্তির পথ খুঁজতে সবাইকে কাজ করতে হবে।’