নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর লুনা বলেছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরাই যে ইলিয়াস আলীকে তুলে নিয়ে গেছেন, এটা নিশ্চিত। সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য ছিল খুবই মর্মান্তিক এবং পরিহাসমূলক। 

তিনি বলেন, ঘটনার পর আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে সাক্ষাতের আয়োজন এবং ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস ছিল লোক দেখানো। ওই সময় বিএনপির পাঁচ দিনের হরতাল ছিল। বিএনপির সে হরতাল, আন্দোলনকে বন্ধ করার জন্যই ছিল ওই আশ্বাস।

সোমবার সকালে গুলশানে হোটেল লেকসোরে বিএনপির সাবেক সাংসদ ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ১০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে ‘ইলিয়াস আলীসহ সকল গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দাও’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিএনপির ছয় শতাধিক নেতাকর্মীর ‘গুম’ হওয়ার ওপর একটি ভিডিও ক্লিপ দেখানো হয়।

আলোচনা সভায় নিখোঁজ সাইদুর রহমানের বাবা শফিকুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম রাসেলের ভাই মশিউর রহমান, পারভেজ হোসেনের ছোট মেয়ে আদিবা হোসেন হৃদি, নুরুজ্জামান জনির স্ত্রী মুনিয়া আক্তার, মনির হোসেনের ভাই ওবায়দুল্লাহ হোসেন তাদের মনোবেদনা ও আকুতির কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে ঢাকাস্থ যুক্তরাজ্য ও কানাডা দূতাবাসের কূটনীতিকরা ছিলেন।

২০১৭ সালে ১৭ এপ্রিল বনানীর আমতলীর কাছ থেকে এম ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক আনসার আলীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

আলোচনা সভার একটি চিত্র

স্বামী নিখোঁজের পর গত ১০ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে আক্ষেপ প্রকাশ করে তাহসীনা রুশদীর বলেন, এই সরকার তাদের নামের সঙ্গে একটি পরিচয় জুড়ে দিয়েছে। সেটি হলো তারা গুম পরিবারের সদস্য। এই গুম পরিবারের সদস্য বলে অফিস-আদালত, দেশের যেখানেই যান না কেন, মানুষ ভয়ে কথা বলতে চায় না। গুম পরিবারের সদস্য মানে যেন তারাও অপরাধ করেছেন। তাদের স্বামী, ছেলে, ভাইকে গুম করা হয়েছে, এ অপরাধ সরকারের নয়, যেন এ অপরাধ তাদের। সুতরাং গুম পরিবারের ছেলে মেয়েরা চাকরি পাবে না, কোথাও কাজ পাবে না। তাদের এ দেশে বাস করার অধিকার নেই।

তাহসীনা রুশদীর বলেন, গুম হচ্ছে সরকারের পরিকল্পিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী যারা মাঠের কর্মী, যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলে, তাদের গুম করা হয়েছে-যাতে এর মাধ্যমে একটি ম্যাসেজ দেওয়া যে স্টপ হয়ে যাও। এগোলেই তোমারদের গুম করা হবে, খুন করা হবে। এ ধরনের একটি ভীতি সঞ্চার করেছিল, যাতে এই সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে না পারে, কেউ আন্দোলন করতে না পারে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সরকার ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন করে। একটি বিনা ভোটের নির্বাচন, আরেকটি ভোট ডাকাতির নির্বাচন। এই দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে ছিল। এটাতে তারা সফল হয়েছে। কিন্তু এভাবে কত দিন, সবকিছুরই তো একটা শেষ আছে।

তাহসীনা রুশদীর বলেন, সরকার অন্ধ হয়ে গেছে। গুমকে স্বীকার করতেই চায় না। কিন্তু অন্ধ হলেই তো প্রলয় বন্ধ হয় না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সেই দিন পর্যন্ত আল্লাহ যেন বাঁচিয়ে রাখেন। যেদিন এ সরকারের পতন দেখতে পারি এবং গুমের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচারটা যেন দেখে যেতে পারি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও দলের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল ও ইলিয়াস আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াসের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণ-অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া, বিএনপির ড. আব্দুল মঈন খান, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এবং বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভেকেট আসাদুজ্জামান আসাদ বক্তব্য রাখেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, জ্যেষ্ঠ নেতা শাহজাহান ওমর, জয়নুল আবদিন ফারুক, শাহজাদা মিয়া, ইসমাইল জবিউল্লাহ, অধ্যাপক সাহিদা রফিক, অধ্যাপক তাজমেরী এস এ ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, অধ্যাপক মামুন আহমেদ, শ্যামা ওবায়েদ, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, মীর হেলাল, ফরিদা ইয়াসমীন, আবেদ রাজাসহ কেন্দ্রীয় নেতারা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।