দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দেড় বছর বাকি থাকতেই হাওয়া লেগেছে রাজনীতির পালে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা করার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে তার এই ঘোষণার নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে আর কখনও নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অতীতে বারবার বিশ্বাস ও আস্থা ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে তারা। দলের নেতারা বলছেন, দেশি-বিদেশি চাপের মুখে অতীতের মতো এখন আবারও বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার নানা কলাকৌশল নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এবার আর কোনো ফাঁদে পা দেবে না বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের বড় অংশ বলছেন, রাজনীতির মূল সংকট নির্বাচনকালীন সরকার। আর নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সংলাপের আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরের দিন গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বলেছেন, যতক্ষণ না আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে আলোচনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। আর শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতায় থাকেন, তাহলে বিএনপি নির্বাচনেই যাবে না; ইভিএম তো পরের কথা।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার প্রথম শর্ত হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, একটি নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। ওই নির্দলীয় সরকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করবে এবং সেই নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে, তাতেই জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও সংসদ গঠিত হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ দেওয়ার বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ একটা মুনাফেক দল। কোনো দিনই কখনও কথা দিয়ে কথা রাখে না। এটা হচ্ছে তাদের চরিত্র।

একইভাবে আওয়ামী লীগের ঘোষণাকে আমলেই নিচ্ছেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, বিশ্বের সব দেশই বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। তাই বিশ্ববাসীকে দেখাতে এখন আওয়ামী লীগ নতুন কৌশল নিচ্ছে। তাদের এ ধরনের বক্তব্যের গুরুত্ব নেই। তারা গায়ের জোরে অতীতেও বারবার একতরফা নির্বাচন করেছে। আবারও তারা একই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরাও এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাব না। আওয়ামী লীগের গত কয়েক দিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা হাস্যকর ও প্রতারণামূলক। ইভিএমের মাধ্যমে ডিজিটাল দুর্নীতি করা হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

বিএনপির নীতিনির্ধারক এই নেতা বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে বিএনপিবিহীন কোনো নির্বাচন আর দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য করা যাবে না বলে তারা বুঝতে পারছে। এবার দেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতেই হবে। কীভাবে তাদের একান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিএনপিকে যুক্ত করা যায়- সে কৌশল নিতে যাচ্ছে তারা। কিন্তু বিএনপি আর আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করবে না। গতবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে নিষ্ম্ফল সংলাপ করেছে। নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতার পথও রুদ্ধ করেছে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ২৯ ডিসেম্বর মাঝরাতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণে কারচুপির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করেছে। বিরোধী নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা করা হয়নি। আর এ কারণে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রতি সব আগ্রহ ফুরিয়ে গেছে। ফলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো এবং সাধারণ ভোটারদের ভোট প্রক্রিয়ার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়।

একই সঙ্গে বিএনপি নেতারা বলেন, বিএনপিকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে সবার আগে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সব মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এ ছাড়া বিএনপি এই সরকারের সঙ্গে কোনো সংলাপে বসার চিন্তাই করতে পারে না।

দলের নেতারা দাবি করেন, বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে আনার জন্য আওয়ামী লীগ বিদেশিদের কাছে ধরনা দিতে শুরু করেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের একাংশের মতে, আগামী নির্বাচনেও পরিকল্পিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ। আবার ওই নির্বাচনের বৈধতা পেতে বিএনপিকেও নির্বাচনে নিতে চায় তারা, যা আপাতত স্ববিরোধিতার শামিল। অন্যদিকে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের কথা বললেও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে এখনও কোনো রূপরেখা তৈরি করতে পারেনি। দু'পক্ষের কেউই এখনও চূড়ান্ত কৌশল ঠিক করতে পারেনি।

বিশ্নেষকদের মতে, বিএনপির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ গতবারের নিষ্ম্ফল সংলাপ ও ভোটের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এটিই এখন দলটির প্রধান টার্গেট বলে এরই মধ্যে বিএনপি ঘোষণাও করেছে। এ পরিস্থিতিতে সমমনা সব বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন প্রশ্নে বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তিতে কৌশল নির্ধারণ করা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সাতটি দল একটি রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবিও তুলে ধরেছে তারা। তবে সাত দলের মধ্যে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে জাতীয় সরকার প্রয়োজন মনে করেন। অন্যদিকে লন্ডনে বসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে বিরোধী শিবিরে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ একাধিকবার প্রমাণ করেছে, তাদের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। দেশে নির্বাচনের পূর্বশর্তগুলোর সবই অনুপস্থিত। রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা কিছুই অবশিষ্ট নেই। এবার 'শেখ হাসিনার বদলে নির্দলীয় সরকার' এবং 'ইভিএমের বদলে ব্যালট পেপার'- এই স্লোগান নিয়ে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির প্রতি দেশি-বিদেশিদের কোনো চাপ নেই; বরং আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার জন্য দলের নেতাকর্মীদের চাপ রয়েছে।