বিএনপিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে আনতে সংবিধানের ভেতরে থেকেই প্রয়োজনীয় ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ। এ জন্য প্রথমেই নির্বিঘ্নে বিএনপির সভা-সমাবেশ করার পরিবেশ তৈরি করা হবে। পরে দরকার হলে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তার পাশাপাশি প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ অবস্থানে দেখতে চায় সংগঠনটি।

আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার বেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহ এবং ইতিবাচক মন্তব্যের পর গতকাল রোববার দলের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করেছেন। বিএনপিকে নির্বাচনে আনার রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও কথা বলেছেন তারা। কেউ কেউ গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত শনিবার গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিএনপিসহ সব দলকে নিয়েই আগামী নির্বাচন আয়োজনের কথা বলার পর এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দলের নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে কোন প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে নির্বাচনে আনা সম্ভবপর হবে, তা জানতে চাইছেন কমবেশি সবাই।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সমকালকে জানিয়েছেন, এরই মধ্যে নির্বিঘ্নে বিএনপির সভা-সমাবেশ করার পরিবেশ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে তারা নিজেদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বিএনপির সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে খোলামেলা কিছু বলতে চাননি। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের এখনও দেড় বছর বাকি। সময় হলে সবকিছু দেখা যাবে।

ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে নিয়েই আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তা ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিএনপির অধিকার- সুযোগ নয়। তবে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। সুতরাং তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নিরপেক্ষ ভোট হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই বলেও মন্তব্য করেছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য সরকারের পদত্যাগ ছাড়া নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা করতে চাইছেন না। তিনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ছাড়া বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিএনপির মহাসচিবের এ বক্তব্যকে মাঠ গরম রাখার কৌশল হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারা। তাদের দৃষ্টিতে, রাজনীতিতে দরকষাকষি থাকবেই। একটা পর্যায়ে সমঝোতা হবে। বিএনপিও নির্বাচনে আসবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সংবিধানের ভেতরে থেকেই প্রয়োজনীয় ছাড় দেওয়া হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা কিছু করার প্রয়োজন, তার সবকিছুই করা হবে। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে নির্বাচন কমিশনকে। প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নিতে হবে। তবে বিএনপির নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি মানার সুযোগ নেই। এটা সংবিধানবিরোধী।

আওয়ামী লীগ নেতারা আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দলীয় কৌশল নিয়ে এখনই সবকিছু খোলামেলা বলতে চাইছেন না। তা ছাড়া এ নিয়ে দলের ভেতরে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে নেতারা বলছেন, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই কৌশল নির্ধারণ করা হবে। সেই কৌশলে থাকবে অনেক কিছুই। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ও। এ ছাড়া আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, আওয়ামী লীগ কখনোই আলোচনার বিরোধী নয়। যে কোনো সমস্যা নিরসনে আলোচনা হতেই পারে। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ নেয়নি এখনও।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কৌশল নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান। তিনি সমকালকে বলেছেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সংবিধানের ভেতরে থেকেই ছাড় দেওয়া হবে। আর সময়ই বলে দেবে, কখন কী করতে হবে। কৌশলও নির্ধারণ করা হবে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। রাজনীতিতে দরকষাকষি থাকবেই। তবে একটা পর্যায়ে সমঝোতা হবে। বিএনপিও নির্বাচনে আসবে।