ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘাতের মুখে আবারও অস্থির হয়ে উঠছে দেশের শিক্ষাঙ্গন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে এসেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। এই পটভূমিতে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। উদ্বিগ্ন দেশের বিশিষ্টজনও। সবাই মনে করছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

তবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতারা এ নিয়ে পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। একে অন্যকে বাক্যবাণে ঘায়েলের চেষ্টাও করছেন তাঁরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভিযোগ, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলকে লেলিয়ে দিয়ে সংঘাত-সহিংসতা সৃষ্টি এ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। আর সরকারবিরোধী প্রধান দল বিএনপি নেতারা বলছেন, ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্যই সরকারি দল ছাত্রলীগকে অস্ত্রে সজ্জিত করে বিএনপির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে।

ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের এই সহিংসতার রাজনীতি বেশ কিছুদিন পর ফিরেছে। দীর্ঘ একযুগ পর গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর 'কটূক্তির' প্রতিবাদে ছাত্রদলের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলায় অন্তত ৩০ জন আহত হন। এর দু'দিন পর বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। এতে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রদর্শন হয়েছে। কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দও শোনা গেছে। গোলাগুলি, ধারালো অস্ত্রসহ লাঠিসোটার আঘাতে কমপক্ষে ৪৫ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিএনপির সরকারবিরোধী কর্মসূচিতেও হামলা চালিয়েছে।

এর আগে ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ওই সংঘর্ষে ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু আহত হন। এরপর থেকেই ছাত্রদল কার্যত ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে একরকম বিতাড়িতই ছিল। একযুগ অনেকটাই নীরব ছিল উভয় পক্ষ। সবশেষ মঙ্গল ও বৃহস্পতিবারের সংঘাতের ঘটনা রাজনীতি সংশ্নিষ্টদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।

রাজনীতি বিশ্নেষকরা বলছেন, অতীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে অস্ত্রের ব্যবহার চলতে দেখা গেছে। বিশেষ করে আশি, নব্বইয়ের দশকসহ বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সহিংসতায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার চলেছে। এই সংঘাত-সহিংসতায় অনেকের প্রাণহানিসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধও রাখতে হয়েছে। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সংঘাত কমে এলেও ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদসহ চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি ঘিরে অনেকবারই ক্যাম্পাসে গোলাগুলি হয়েছে। সরকার ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে বেশ কিছুদিন এটাও বন্ধ ছিল। বৃহস্পতিবার ঢাবি ক্যাম্পাসে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলেছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, 'আমার শঙ্কা, ঢাবি ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল বা সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যে যে সংঘাত-সহিংসতা চলছে, এ ধরনের সংঘর্ষ ক্রমেই বাড়বে। কেননা, দেশের গণতন্ত্র সীমিত হয়ে পড়েছে। আর গণতন্ত্র যত সীমিত হয়, সংঘর্ষ ততই বাড়ে। আমাদের রাজনীতি ক্রমেই হিংস্র হচ্ছে।'

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থগুলোর হিসাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল। গণতন্ত্র এখানে পলায়নপর। গণতান্ত্রিক চর্চা যখন সীমিত হয়ে যায়, তখন সহিংস আচরণ খুবই স্বাভাবিক পরিণতি। অতএব, এসব সংঘর্ষে দুঃখজনকভাবে বহু নিরীহ লোকজন আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা দেশের গণতন্ত্র ও শান্তি-শৃঙ্খলার জন্যও অশনিসংকেত।

লেখক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের দখলে রাখার অংশ হিসেবে এই সংঘাত-সহিংসতা ঘটছে। তবে এটা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। গণতন্ত্র ও শান্তিশৃঙ্খলার সঙ্গে এটা যায়ও না।

দেশের গণতন্ত্র ও শান্তির জন্যই এটাকে দমন জরুরি। তবে মুশকিলটা হচ্ছে, ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের রাজনীতি ছাত্রসমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের কল্যাণের জন্য নয়। তারা মূল দলের স্বার্থরক্ষার জন্যই কাজ করে। আবার তাদের মূল দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিও কখনও সমঝোতার পথে হাঁটে না। একে অপরের সঙ্গে আলোচনায়ও যায় না। গণতন্ত্র ও স্থিতিশীল রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সব পক্ষকে সমঝোতা ও সৌহার্দ্যের রাজনীতির পরিবেশ রক্ষার জন্য এগিয়েও আসতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজমুদার বলেন, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ভূমিকা বোধগম্য নয়। দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে এবং সরকারের স্বার্থেই ছাত্রলীগের সহনশীল থাকা উচিত ছিল। তাদের এই আক্রমণাত্মক ভূমিকা অব্যাহত থাকলে দেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

এর মধ্যেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার চিরাচরিত 'দোষারোপের রাজনীতি'ও অব্যাহত রয়েছে। অন্য সব ইস্যুর মতো ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘাত ইস্যুতেও পরস্পরবিরোধী অভিযোগ চলে আসছে। প্রায় দিনই পরস্পরের বিরুদ্ধে বাক্যবাণ আর অভিযোগের তীর ছুড়ছেন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতারা। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের বদলে তাঁরা সংঘাত-সহিংসতাকে আরও উস্কে দিচ্ছেন কিনা- এমন প্রশ্নও উঠেছে সব মহলে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণ ঠেকাতে না পেরে বিএনপি এখন দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। এই সেতু উদ্বোধনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাশ ফেলার ষড়যন্ত্র করছে তারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, সরকার চতুর্দিক থেকে ঘেরাও হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে তারা বিচ্ছিন্ন ও সমর্থনশূন্য। মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। এ কারণেই ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রচেষ্টা হিসেবে তাদের লাঠিয়াল বাহিনী ছাত্রলীগকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ষড়যন্ত্র চলছে। এর অংশ হিসেবেই ছাত্রদলকে মাঠে নামানো হয়েছে। তবে যত ষড়যন্ত্রই করুক না কেন, বিএনপির কোনো ষড়যন্ত্রই শেষ পর্যন্ত সফল হবে না। শান্তিপ্রিয় ছাত্রসমাজ ও জনগণই তাদের রুখে দাঁড়াবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার একদিকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাধা না দেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী দল ও মতকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়েছে। জনরোষ থেকে বাঁচতে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগকেও সশস্ত্র অবস্থায় মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। তবে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লাঠি ও অস্ত্র দিয়ে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিচ্ছেন- তাঁদের পরিণতি শুভ হবে না।

ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল নেতারাও পরস্পরবিরোধী অভিযোগ করে চলছেন। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেছেন, ছাত্রদল ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসকে উত্তপ্ত করতে চাইছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাবি ক্যাম্পাসে মিছিলের নামে মহড়া দিচ্ছে তারা। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকে শান্তিপূর্ণ রাখতে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করেছে। ছাত্রলীগ তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে।

অন্যদিকে, ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, দেশে গণতন্ত্র না থাকায় এর প্রভাব সব জায়গায়ই বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে পুরো জাতি অতিষ্ঠ। এখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন। আগামীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছাত্রলীগের অপকর্মকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবে ছাত্রদল।