অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়তে সাংস্কৃতিক জাগরণের বিকল্প নেই। সাংস্কৃতিক জাগরণে সংস্কৃতি খাতে আরও বরাদ্দ দিতে হবে। দেশের প্রত্যেকটি জেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করতে হবে। সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ না বাড়িয়ে সাংস্কৃতিক জাগরণ সম্ভব নয়। 

শনিবার বিকেলে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম এক শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ দেওয়ার দাবিতে সমাবেশে বক্তারা এ কথা বলেন। 

উদীচী সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, উদীচীর সহ-সভাপতি প্রবীর সরদার, জামসেদ আনোয়ার তপন, ইকরামুল কবির খান, সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, ঢাকা মহানগরের সভাপতি নিবাস দে ও সহ-সাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান। সমাবেশে গণসগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সাজেদা বেগম সাজু ও মায়েশা সুলতানা ঊর্বি।

সমাবেশে উদীচীর সভাপতি বদিউর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট সংস্কৃতিবান্ধব নয়। এ বাজেট দেশের সংস্কৃতিকর্মীদের হতাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যে ধরনের এদেশে মৌলবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে সেগুলো রোধ এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করার পাশাপাশি দেশকে অসাম্প্রদায়িক, মৌলবাদমুক্ত, মানবচেতনাসম্পন্ন ধারায় পরিচালনা করতে গেলে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বও বারবার তাদের বক্তব্যে নিজেদেরকে সংস্কৃতিবান্ধব হিসেবে উল্লেখ করে দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু, সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে গেলে যে ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই বাজেটে সংস্কৃতি খাত অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। 

তিনি বলেন, বাজেটের ন্যূনতম এক শতাংশ সংস্কৃতি বরাদ্দের জন্য দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবিক অর্থে শূন্য দশমিক এক শতাংশেরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাই দেশে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার বিকাশের স্বার্থে অবিলম্বে জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম এক শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। প্রত্যেকটি জেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, এ রাষ্ট্রের জন্ম একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ওপর। কিন্তু স্বাধীন এ রাষ্ট্রের বাজেট যখন দেওয়া হয় তখন বারবার সংস্কৃতি খাতের বাজেট থেকে তলানিতে। গত বছর যে বাজেট দেওয়া হয়েছিল এ বছর বাজেটের আকার বাড়লেও অনুপাতে সংস্কৃতি খাতের বাজেট বাড়েনি। কিন্তু রাষ্ট্রের অনেকেই বলেন বাজেট দেওয়া হলেও তা খরচ হয় না। আদতে খরচ করার সুযোগই দেওয়া হয় না। 

তিনি বলেন, দেশের গ্রামে অঞ্চলে আজকে যাত্রা গান পালা গান এখন আর নেই। আমাদের লোক সংস্কৃতি ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাঙালি এ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয় না। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কোনো যাত্রাপালা আয়োজন করা হয়নি। উপজেলা পর্যায়ে প্রত্যেকটি পর্যায়ে কর্মকর্তা কর্মচারী থাকলেও সাংস্কৃতিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নেই। বাজেটের আগে সংস্কৃতি ও অর্থমন্ত্রীর সাথে বাজেট উত্তর সভা করতে চাইলেও তারা সারা দেননি।

তিনি বলেন, মনন ও চেতনার উন্নতি না ঘটলে দেশের উন্নয়ন টেকশই হবে না। উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়ে অর্থনীতি বাঁধাগ্রস্ত হবে। তাই দেশের টেকশই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে আরও বাজেট বাড়াতে হবে। 

সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, সরকার উন্নয়ন বলতে অবকাঠামো উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই বোঝে। জাতির মনোজগতের উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক উন্নয়নকে তারা হিসাবেই নিচ্ছে না। ফলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ধর্মীয় উগ্রতা, কূপমন্ডুকতা এবং চরম অসহিষ্ণুতায় নিমজ্জিত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের আরও বিস্তৃতি ঘটছে। 

তিনি বলেন, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্য বিস্মৃত হচ্ছে আমাদের গোটা জাতির। কিন্তু দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐক্য নস্যাৎ করে শোষণ ও লুণ্ঠনের পথই অবারিত করা হচ্ছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী কালেও সংস্কৃতি নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো কর্মসূচি নেই। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার যে সাংস্কৃতিক জাগরণ এই দেশে সংঘটিত হওয়ার কথা ছিল তাও হয়নি। কারণ সরকার সংস্কৃতি খাতকে গুরুত্বই দেয়নি কখনো। প্রতিবছর বাজেটে সংস্কৃতি খাতকে সীমাহীন উপেক্ষার মুখে পড়তে হয়।

উদীচির এ নেতা বলেন, সারাদেশই উদীচীর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলে। রাষ্ট্রীয় সকল দিবসে উদীচীর অংশগ্রহণ থাকে। কিন্তু বাজেট বাড়ছে না। এ ছাড়া সংস্কৃতি চর্চার আশ্রয়স্থল শিল্পকলা একাডেমির অনেক জেলা অফিস প্রশাসনের অন্যান্য সংস্থার দখলে। এভাবে একটি জাতির সংস্কৃতির উন্নয়ন হবে না। আর সংস্কৃতির উন্নয়ন না হলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন হবে না। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন হবে না।