কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, এ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পাস করেছেন, তবে তা দ্বিতীয় বিভাগে। অথচ মার্চ মাসে কাজী হাবিবুল আউয়ালকে যখন সিইসি পদে বসানো হয় তখন জাফরুল্লাহ বলেছিলেন, আমরা একজন টিএন সেশন পেয়েছি। টিএন সেশন ১৯৯০-৯৬ সালে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। ভারতীয় নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, বিশেষত নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকরে তাঁর কঠোর মনোভাব শুধু ভারত নয়; গোটা উপমহাদেশেই তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, হাবিবুল আউয়াল জাফরুল্লাহর কাছেই যদি দ্বিতীয় বিভাগ পান; যাঁরা শুরু থেকেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন, তাঁরা তাঁকে কত নম্বর দেবেন?
প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সমালোচকদের সন্তুষ্টির ওপরেই নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল এতে অংশ নেবে। বিএনপি ও তার মিত্ররা বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দিলেও, পর্যবেক্ষকদের ধারণা- একটা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসি যদি তাদের আন্তরিকতা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে দেড় যুগের মতো ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি ওই ঘোষণায় অনড় নাও থাকতে পারে। আর এমন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক মহলও, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব যে স্বাগত জানাবে, তা বলতে কারও বিশেষজ্ঞ হতে হবে না।
বলা দরকার, বিগত দুটো জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জনপরিসরে তো বটেই; পশ্চিমা দেশগুলোতেও প্রশ্ন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলো এরই মধ্যে বলে দিয়েছে- বাংলাদেশে আগামীতে তারা 'মানসম্মত' নির্বাচন দেখতে চায়। কেউ কেউ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং মার্কিন আধিপত্যাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাশিয়া-চীনের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গ টেনে পশ্চিমাদের ওই প্রত্যাশাকে গুরুত্ব না দিতে পারেন। কিন্তু এটা স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন আমাদের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের কাছে বিশেষত আর্থিক কারণে কতটা লোভনীয়, তা সবাই জানেন। আবার এ মিশনের ওপর পশ্চিমাদের প্রভাব কতটা, তাও বিস্তারিত বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না।
বিষয়টির গুরুত্ব সিইসি খুব ভালোভাবে বোঝেন বলে আমার মনে হয়। ঝানু আমলা বলতে যা বোঝায়, অনেকের মতে, কাজী হাবিবুল আউয়াল তেমনই একজন ছিলেন দীর্ঘ কর্মজীবনে। বিষয়টি তিনি বোঝেন বলেই দায়িত্ব গ্রহণের পরপর সবার সামনে এই বলে অঙ্গীকার করেছিলেন- সব অংশীজনের, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা তা করবেন। তিনি এমনও বলেছেন, তাঁদের দুই পূর্বসূরি- রকিবউদ্দীন কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশন, যারা বিগত দুটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করেছে; যে লিগাসি রেখে গেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসবেন। এমনকি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা যখন এ সময়ে বহুল চর্চিত দিনের ভোট-রাতের ভোট প্রসঙ্গ তুলেছেন, তখন তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন- তাঁদের অধীনে দিনের ভোট দিনেই হবে।
সত্যি বলতে কি, তাঁর এ চাঁছাছোলা মনোভাব ও দেহভঙ্গি মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তা ছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত বেশ কিছু পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিশেষ করে প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে তাঁরা যে কড়া মনোভাব দেখিয়েছেন, তা-ও সাধারণ মানুষ শুধু নয়; অনেক নির্বাচন পর্যবেক্ষককেও মুগ্ধ করেছে। ঝিনাইদহ পৌর নির্বাচনে তো আচরণবিধি ভঙ্গের অপরাধে শাসকদলীয় প্রার্থীর প্রার্থিতাই বাতিল করে দেয় নির্বাচন কমিশন।
কুসিক নির্বাচনেও অন্তত প্রার্থীদের আচরণবিধি মানার প্রশ্নে ইসিকে বেশ কঠোর অবস্থানে দেখা গেছে। কিন্তু গোল বেধেছে সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্যকে আচরণবিধির আওতায় আনতে গিয়ে। বিদ্যমান আচরণবিধি অনুসারে, সরকারি সুবিধাভোগী কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না। সরকারের কাছ থেকে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগকারী হিসেবে কুমিল্লার সাংসদকেও এ বিধি মেনে চলার কথা। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত কুসিক নির্বাচনে তিনি তা মানেননি। এমনকি 'নির্বাচনী এলাকা ত্যাগের নির্দেশনা প্রদান'-এর জন্য ইসি 'সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে' মর্মে সাংসদকে চিঠি দেওয়ার পরও সাংসদ তাঁর অবস্থানে অনড় থাকেন। তার পরও ইসি ওই নির্দেশনা কার্যকর করতে পারেনি। আরও বিস্ময়কর হলো, সাংবাদিকদের ইসির এ ব্যর্থতা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের মুখে সিইসি তাঁদের আর কিছুই করার নেই বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই কুসিক নির্বাচনের শেষ ক'দিন ইসির এ ব্যর্থতাই ছিল সর্বত্র প্রধান আলোচনার বিষয়। প্রশ্ন উঠেছে, একযোগে ৩০০ আসনের নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে ইসি কীভাবে সক্ষম হবে?
নির্বাচনের ফল ঘোষণা করতে গিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাঝপথে ফল ঘোষণা বন্ধ করা একটা হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণার সময় উদ্ভূত বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই কর্মকর্তার ব্যর্থতার কারণেই ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। কারণ একটা প্রকাশ্য সভায় তা-ও শেষ মুহূর্তে ভোটের ফল পাল্টানো প্রায় অসম্ভব। তবে এ ঘটনা যে সমালোচকদের আস্থা অর্জনে ইসির প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দেবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে ইসি যদি নির্বাচনী আচরণবিধি মানতে কুমিল্লার ওই সংসদ সদস্যকে বাধ্য করতে পারত, তাহলে অংশীজনের কাছে ইসির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ত বলে অনেকের বিশ্বাস। এমনকি নির্বাচনকালে সংসদ সদস্যকে দেওয়া তাঁদের নির্দেশনার ব্যাপারে দু'জন নির্বাচন কমিশনার যে দৃঢ় মনোভাব দেখিয়েছিলেন; নির্বাচনের পরও যদি তা ধরে রাখা যেত তাহলে কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল সম্ভব হতো বলে আমার ধারণা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসি তা পারেনি। নির্বাচন-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে সিইসি একেবারে ভোল পাল্টে বলে দিলেন, তাঁরা সংসদ সদস্যকে আদৌ ওই নির্দেশনা দেননি! এমনকি তিনি এমনও বললেন, এ ধরনের এখতিয়ারই নাকি তাঁদের নেই। অথচ বিশেষজ্ঞরা তো বটেই; সরকারি দলের লোকেরাও বলে থাকেন, দিনকে রাত বা রাতকে দিন বানানো ছাড়া অথবা নারীকে পুরুষ কিংবা পুরুষকে নারীতে রূপান্তর করা ছাড়া আর সবই করার ক্ষমতা রাখে আমাদের ইসি। সিইসিকে মনে রাখতে হবে- জাতির প্রয়োজনেই তাঁকে দুই পূর্বসূরির লেগাসি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য তাঁকে সংবিধান প্রদত্ত এ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।
সাইফুর রহমান তপন :সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রনেতা