রংপুর মেডিকেল কলেজ বা রমেক হাসপাতাল নিয়ে শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে যা লেখা হয়েছে, তার মানে যদি এ-ই করা হয়- উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এ হাসপাতালে সবই আছে; শুধু চিকিৎসাই নেই; তাহলে হয়তো ভুল বলা হবে না। প্রতিবেদনমতে, সেখানে অনিয়ম আর দুর্নীতি লাগামছাড়া। পুরো ব্যবস্থাটাই নিয়ন্ত্রণ করে দালালচক্র। ফলে যে ওষুধ রোগীর বিনা পয়সায় পাওয়ার কথা, তা কিনতে হয় আশপাশের ওষুধের দোকান থেকে। রোগী ভর্তি করতে গুনতে হয় নির্ধারিত ফির কয়েক গুণ টাকা। বেড পেতে হলেও দালালের দ্বারস্থ হতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষাও দালালের মাধ্যমে বাইরে থেকে করিয়ে আনতে হয়। এমনকি রোগীর মৃত্যুর পর লাশ বের করতে হলেও ওয়ার্ড বয় বা ট্রলি বয়কে তাদের চাহিদামতো টাকা দিতে হয়। এ পরিস্থিতিতে রোগী ও তাঁর স্বজনদের অবস্থা কী দাঁড়ায়, তা আর বলে দিতে হয় না। আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, চিকিৎসার নামে রোগীদের এমন হয়রানি ও শোষণ দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা আছে বলে মনে হয় না। যে কারণে সমকালের প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এক ধরনের দায়সারা উত্তর দিয়ে বলেছেন, তিনি চেষ্টা করছেন হাসপাতালকে দুর্নীতি ও অনিয়ম থেকে বের করে আনার। তবে কতটুকু সফল হবেন, তা তিনি বলতে পারেন না।

আমরা এর আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ বা রামেক হাসপাতাল নিয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায় একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে দেখেছি। তখন এমনকি এ ধরনের দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র তুলে ধরার জন্য ওই হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার দুঃখজনক দৃশ্যও আমাদেরকে দেখতে হয়েছে। এ ঘটনা তখন সংবাদমাধ্যমসহ সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু তাতে যে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হাসপাতালটি রোগীবান্ধব হয়েছে- এমন দাবি করা যায় না। শুধু রমেক বা রামেক নয়; যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তব্যক্তিদের একেবারে নাকের ডগায়; সেখানেও কি রোগীবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে? বাস্তবে, প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই বছরের পর বছর এ দুরবস্থা চলছে। অনেক আবেদন-নিবেদন, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সত্ত্বেও পরিস্থিতির খুব একটা ইতরবিশেষ হচ্ছে না। দেখা যায়, একটা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটলে বা ওই হাসপাতালের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আলোচনার জন্ম দিলে সংশ্নিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন। তদন্তের নামে একটু দৌড়ঝাঁপ করেন। তারপর আলোচনাটি থিতিয়ে গেলে আবার নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। অভিযোগ আছে, সরকারি হাসপাতালগুলোর এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ে ওই কর্তাব্যক্তিদের উদাসীনতার পেছনে আছে একদিকে তাঁদের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে অবহেলা, আরেকদিকে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁদের পক্ষপাত। কারণ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা সাধারণ মানুষকে সেবার জন্য বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করে। এর ফলে ইতোমধ্যে বহু বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকরা রীতিমতো আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, ১৯৮০-এর দশকেও এদেশে ধনী-গরিব নির্বিশেষে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যেত। তখনও সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান বেশ উন্নত ছিল। কিন্তু ওই দশকেই প্রধানত নয়া উদারতারবাদের বাড়বাড়ন্তের সুযোগে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার পরামর্শে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক পরিষেবার খাতগুলো বেসরকারীকরণ শুরু করে। পরিণাম, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত সংকুচিত এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত প্রসারিত হতে থাকে।

কিন্তু সরকারকে বুঝতে হবে, বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবার যে গলাকাটা দাম, তা বহন করা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক অনিয়মের পরও সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা খরচ এখনও অনেকাংশে সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে আছে। তাই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। তবে দুর্নীতি-অনিয়ম যেভাবে রমেকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে; কোনো টোটকা দিয়ে সেগুলোতে শৃঙ্খলা আনা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে অচিরেই তা শুরু হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

বিষয় : সর্বাঙ্গে ব্যথা সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন