সরকার হটাতে নেতাকর্মীদের রাজপথ দখলের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বিএনপি নেতারা। তাঁরা বলেছেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে, সেটা আমাদের প্রাণের লড়াই, বেঁচে থাকার লড়াই। শুধু বিএনপির নয়, এটা দেশের ১৮ কোটি মানুষকে বাঁচানোর লড়াই। রাস্তায় নেমে গেছি, দাবি আদায় করেই ফিরব।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ানো, নজিরবিহীন লোডশেডিং, গণপরিবহনের ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ ভোলায় বিএনপির দুই নেতার হত্যার প্রতিবাদে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ বিএনপির যৌথ আয়োজনে এ সমাবেশ দুপুর ২টায় শুরু হলেও সকাল ৯টা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীর ঢল নামে নয়াপল্টন ও এর আশপাশের এলাকায়। কখনও ঘাম ঝরানো রোদ, আবার কখনও বৃষ্টিতে ভিজে নেতাকর্মীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের দু'পাশের রাস্তায় অবস্থান নেন। একসময় এ সমাবেশ ফকিরাপুল থেকে নাইটিংগেল মোড় ও আশপাশের অলিগলিতে ছাড়িয়ে পড়ে। ফলে ওই এলাকায় যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।


সমাবশে প্রধান অতিথি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই লড়াইয়ে অবশ্যই আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, আমাদের রাজপথ দখল করতে হবে। রাজপথের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমরা অবশ্যই এই ফ্যাসিস্ট দানবীয় সরকারকে সরিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটা জনগণের সরকার, জনগণের রাষ্ট্র, জনগণের সমাজ তৈরি করব। আগামী ২২ আগস্ট থেকে সারাদেশে উপজেলা-জেলা-মহানগর পর্যায়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি অব্যাহতভাবে চলবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।

তিনি বলেন, আমরা গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ব। জেলা-উপজেলা, মহানগরে জনতার শান্তিপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করব।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, আজ চাল, ডাল, তেল সব কিছুরই দাম বেড়ে যাচ্ছে। আরেকদিকে বিদ্যুতের সমস্যা আরও বাড়ছে। সরকার আমদানি করার জন্য, দুর্নীতি ও চুরি করার জন্য আমার দেশের গ্যাস উত্তোলনের কোনো ব্যবস্থা করেনি। তাদের নিজস্ব লোকদের দিয়ে গ্যাস আমদানির ফলে আজ বিদ্যুতের দাম অনেক বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টগুলোকে প্রতি বছর ২৮ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ৭৮ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। গত সাত বছরে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে হিসাব আছে ২৪০ বিলিয়ন ডলারের। প্রশ্ন আমাদের- এই ৩০ বিলিয়ন ডলার কোথায় গেল? কারা নিয়ে গেল? তা জনগণ জানতে চায়।

সমাবেশে যোগ দেওয়ার সময়ে বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও বাধা দেওয়ার অভিযোগ করে তাদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিও জানান বিএনপি মহাসচিব।

বিএনপির বিদায়ের সময় হয়েছে- ক্ষমতাসীন এক মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সমালোচনা করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি বিদায় হবে না। বিদায় হবে এই অবৈধ সরকার। দেশ দেউলিয়ার দিকে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার চেয়েও বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ। তাই আজ আমাদের রাস্তায় নামতে হবে। এর দায়িত্ব বিএনপিকে নিতে হবে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, দেশকে আওয়ামী লীগ দেউলিয়ার পথে নিয়ে গেছে। গত ৫ বছরে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এই সরকারে পতন ঘটাতে হবে। কারণ সব গুম, খুন ও হত্যার বিচার করতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের দাবি একটাই- শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে, এই সংসদ বাতিল করতে হবে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার দিতে হবে, এই নির্বাচন কমিশন বাতিল করতে হবে। আমরা যখন রাস্তায় নেমেই গেছি। আমরা দাবি আদায় করেই ফিরব।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপির অনেক নেতা জীবন দিয়েছে, গুম ও খুন হয়েছে। সরকার দেশ চালাতে পারছে না, মিথ্যা কথা বলছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে হবে। আর সাহস করে রাজপথে নামতে হবে।

ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশ আজ লুণ্ঠিত। এই দুর্নীতিবাজ সরকারের লুণ্ঠন থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করা এখন সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ওপর একটা ইমানি দায়িত্ব। সবাই মিলে এই লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাই।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু এবং ঢাকা উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হকের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়াম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য দেন।

দলের অঙ্গসংগঠনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, যুবদলের সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ওলামা দলের নজরুল ইসলাম তালুকদার, মৎস্যজীবী দলের রফিকুল ইসলাম মাহতাব, ছাত্রদলের কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে নিতাই রায় চৌধুরী, ফজলুর রহমান, আতাউর রহমার ঢালী, আবদুল কুদ্দুস, মাহবুব উদ্দিন খোকন, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শ্যামা ওবায়েদ, শিরিন সুলতানা, নাজিম উদ্দিন আলম, রকিবুল ইসলাম বকুল, কামরুজ্জামান রতন, মীর সরাফত আলী সপু, মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু, আজিজুল বারী হেলাল, এবিএম মোশাররফ হোসেন, রেহানা আখতার রানু, শাম্মী আখতার, হেলেন জেরিন খান, সাইফুল আলম নিরব, আমিরুল ইসলাম খান আলিম, সেলিমুজ্জামান সেলিম, মাশুকুর রহমান মাশুক, শামীমুর রহমান শামীম, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, মীর নেওয়াজ আলী, আমিরুজ্জামান শিমুল, রাজিব আহসান, আকরামুল হাসান, মহানগর বিএনপির ইশরাক হোসেন, হাবিবুর রশীদ হাবিব, সাইফ মাহমুদ জুয়েলসহ অঙ্গসংগঠন ও মহানগরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

উত্তরায় ১৪৮ সন্দেহভাজন আটক: রাজধানীতে পাঁচটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ১৪৮ সন্দেহভাজন যাত্রীকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বিমানবন্দর ও উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে এসব যাত্রীকে আটক করে।

জানা গেছে, বিএনপির পূর্বঘোষিত সমাবেশে যাওয়ার পথে তাঁদের আটক করা হয়। তাঁরা গাজীপুর জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এ ব্যাপারে সমাবেশস্থলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে আগের দিন থেকে দলের নেতাকর্মীদের আটক করেছে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুর থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশে আসার পথে উত্তরা থেকে তাঁদের দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে।

এদিকে হঠাৎ একসঙ্গে এত যাত্রী আটক করার কারণ জানতে চাইলে ঢাকার উত্তরা বিভাগের দুই থানার পুলিশ জানায়, গতিবিধি সন্দেহভাজন মনে হওয়ায় তাদের আটক করা হয়েছে। থানায় আটক যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।