দীর্ঘ বিরতি ভেঙে রাজপথে ফিরেছে বিএনপি। এতে দলের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা, উজ্জীবিত। এটিকে আগামীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের রসদ মনে করছে দলের হাইকমান্ড। তারা এখন নেতাকর্মীদের এই উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে ধারাবাহিক সভা-সমাবেশ কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করছে।

এতদিন বিএনপি সভা-সমাবেশ কিংবা বিক্ষোভ অনেকটা ঘরোয়াভাবে অথবা বড়জোর জাতীয় প্রেস ক্লাবে করে আসছিল। কিন্তু সবশেষ গত বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে ঢাকা মহানগর বিএনপি সমাবেশ করে। এতে বিপুল লোকসমাগম হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার কিংবা প্রশাসন কোনো বাধা দেয়নি।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এই সমাবেশ নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করেছে। সমাবেশে লুটপাটসহ ব্যর্থতার দায়ে এখনই ক্ষমতাসীনদের পদত্যাগের যেমন বার্তা রয়েছে, তেমনি আন্দোলন-সংগ্রামের বিষয়েও নতুন বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে অবৈধ পথে ক্ষমতায় যাওয়া সহজ হবে না। নির্দলীয় সরকার ছাড়া একতরফা নির্বাচন মেনে নেবে না বলেও স্পষ্ট করেন বিএনপি নেতারা।

অবশ্য গতকাল শুক্রবার এক সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে সরকার বিদেশি চাপে আছে। এ জন্য কিছুদিন ধরে বিএনপির বিক্ষোভ-সমাবেশে কোনো ঝামেলা করছে না। তারা (সরকার) দেখাতে চাইছে, আমরা গণতান্ত্রিক দল, এ জন্য বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছি। আসলে এগুলো তাদের প্রতারণা।

বিএনপির রাজপথে ফেরার শুরু ভোলা দিয়ে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাটের বিরুদ্ধে টানা কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। এতদিনের ঘরোয়া রাজনীতি থেকে দলটিকে রাস্তায় আনে ছাত্রদল। ভোলায় পুলিশের গুলিতে জেলা ছাত্রদল সভাপতি নূরে আলম নিহতের প্রতিবাদে গত ৬ আগস্ট নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ছাত্র সামবেশ হয়। স্বল্প সময়ের নোটিশে হাজারো নেতাকর্মী জমায়েত হন। এরপর থেকে যুবদল, কৃষক দলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে সমাবেশ কর্মসূচি পালন ও সফল করছেন।

দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপির এই সমাবেশ কেবল ঢাকা মহানগর নয়, তৃণমূল নেতাকর্মীদেরও চাঙ্গা করে তুলেছে। নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, আন্দোলন-সংগ্রাম সঠিক পথেই আছে। একই সঙ্গে যে দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে তাও জনগণের দাবিতে পরিণত করতে পেরেছে। ফলে জনগণ এখন বিএনপির ডাকে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন।

যুবদল সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, এ ধরনের সভা-সমাবেশে ব্যাপক অংশগ্রহণ হলো চলমান আন্দোলনের একটি ধাপ। প্রচণ্ড প্রতিকূল সময়ের মধ্যে সেই ধাপের একটি অংশ পালন করছে বিএনপি। আমাদের সমাবেশে জনগণের ঢল প্রমাণ করে, তাঁরা এই সরকারের প্রতি অনাস্থা জনিয়েছে। সবদিকে ব্যর্থ সরকারের দিন ফুরিয়ে আসছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে সরকার পতনের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।

বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির বলেন, বর্তমান সরকারের ভোট ডাকাতি ছাড়াও লুটপাট, চুরি আর টাকা পাচারের খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, নিত্যপণ্যের চড়া দামে মানুষের নাভিঃশ্বাস। এ অবস্থার পরিবর্তন চান বলে তাঁরাও মাঠে নেমেছেন। এ জন্য বিএনপির কর্মসূচিতে নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির সমাবেশগুলো স্বল্প সময়ের নোটিশে করা হয়েছে। প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই স্বপ্রণোদিত হয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মী সমর্থক ও সাধারণ মানুষ যোগ দিয়েছেন। সমাবেশ ঘিরে আগের রাতে পুলিশের বিশেষ অভিযান, গ্রেপ্তার, নির্যাতন সত্ত্বেও এত উপস্থিতিতে অনেকে অবাক হয়েছেন। দলের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়নি। এরপরও কেউ সমাবেশস্থল ত্যাগ করেননি। দিনভর স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রেখেছেন। উল্টো নেতাকর্মীরাই সরকার পতন আন্দোলনের কর্মসূচি ধীরে ধীরে আরও কঠোর হোক চেয়েছেন। তৃণমূল থেকে কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে শীর্ষ নেতাদের কাছে ধারাবাহিক কর্মসূচির দাবি জানানো হয়েছে। নেতাকর্মীদের এই প্রবল আগ্রহ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ব্যাকুলতা হাইকমান্ডকেও সাহস জোগাচ্ছে।

দিনাজপুর সদর থানা বিএনপির সভাপতি আবু বকর বলেন, সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, ভোট ডাকাতি, গণতন্ত্র হরণ ছাড়াও এখন জ্বালানি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশেহারা। নেতাকর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসছেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বৃহস্পতিবার সমাবেশে জনতার ঢল নেমেছিল। অসংখ্য নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে অবৈধ সরকারের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই। তাঁরা ফের একতরফা নির্বাচন করতে চান। কিন্তু সে নির্বাচন দেশের মাটিতে আর হবে না, হতে দেওয়া হবে না। এবার চারদিকে তাদের পতনের আওয়াজ উঠেছে।