বিরোধীরা আন্দোলন করুক, কাউকে যেন গ্রেপ্তার করা না হয়- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যে আস্থা নেই বিএনপির। দলটির নেতারা ওই বক্তব্যকে প্রধানমন্ত্রীর চিরাচরিত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের অভিযোগ, এর আগেও এ ধরনের বক্তব্য কিংবা নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। বিএনপি নেতারা মনে করেন, এটা আওয়ামী লীগের এক ধরনের কৌশল। নির্বাচনের আগে নিজেদের হারানো ঐতিহ্য 'গণতান্ত্রিক দল' হিসেবে বিশ্বের সামনে পরিচিত করতে তারা এটা করছে।

গত রোববার গণভবনের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চলমান আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের বিরোধীরা একটা সুযোগ পাচ্ছে। তারা আন্দোলন করছে। সেটা করুক, আমি তো চাচ্ছি। আমি নির্দেশ দিয়েছি, তারা আন্দোলন করছে, করতে দাও। খবরদার, কাউকে যেন গ্রেপ্তার করা না হয়।'

যদিও প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের আগেই এ মাসের শুরু থেকে বাধাহীনভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। দীর্ঘদিন রাজপথে ধারাবাহিক অনুপস্থিতির পর গত বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে বড় ধরনের সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে দলটি। এর আগে ছাত্রদল, যুবদল, কৃষক দলের উদ্যোগেও নয়াপল্টনে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের এই নীরবতা বিএনপিকে কিছুটা হলেও ধন্দে ফেলেছে। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও মাঠ পর্যায়ের আচরণ বিবেচনায় এটি অতি অস্বাভাবিক হিসেবে মনে করছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের ভয়াবহ দুঃশাসনে দেশের মানুষ যখন অতিষ্ঠ, লোডশেডিং-গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংকটে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে- সে সময়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে নিতেই সরকার এ কৌশল নিয়েছে। এ জন্য ইদানীং তাদের সমাবেশে খুব বেশি ঝামেলা করা হয়নি। মূলত নির্বাচন সামনে রেখে সরকারকে বিদেশিরা চাপে রেখেছে। তাই বেশ কিছুদিন ধরে বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে সরকার কোনো ঝামেলা করছে না। তিনি বলেন, এখন তারা দেখাচ্ছে যে বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছি। তারা দেখাচ্ছে, আমরা তো গণতান্ত্রিক দল; আমরা কোনো ঝামেলা করি না। এটা প্রতারণা। এই প্রতারণা তাদের চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
গতকাল বুধবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আমরা কখনোই প্রধানমন্ত্রীর কোনো কথায় বিশ্বাস করি না। তারা যা বলে, তা করে না।

বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা বলেন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। এবারও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে বলে তাঁরা মনে করছেন না। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট গত রোববার বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে- এমনটা জাহির করতে প্রধানমন্ত্রী এ কৌশল নিয়েছেন। তিনি বিশ্বকে দেখাতে চাইছেন- দেশে গণতন্ত্র আছে, বিরোধী দলের রাজনীতি করার সুযোগ রয়েছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেওয়ার পর বিএনপির রাজপথের কর্মসূচি পালিত হয়নি। তাই গ্রেপ্তার না থাকলেও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৭৮তম জন্মদিন উপলক্ষে ঘোষিত ঘরোয়াভাবে দোয়া-মিলাদের কর্মসূচিতে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা করছে, গাড়ি ভাঙচুর করেছে, নেতাকর্মীদের আহত করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে লালমনিরহাটে হামলার ঘটনায় যুবদলের নেতাকর্মী বহনকারী গাড়ি ভাঙচুরসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আহত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা মুখে যা বলেন, করেন তার উল্টোটা। তাঁর কথা বিশ্বাস করা মানে বোকার স্বর্গে বাস করা। তিনি বলেছিলেন- যারা আন্দোলন করবে কিংবা গণভবনও যদি কেউ ঘেরাও করে, তাহলে তাদের চা খাওয়াবেন। এর পরপরই ভোলায় বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি করে জেলা ছাত্রদল সভাপতি নুরে আলম ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রহিমকে হত্যা করেছে। এখন বলছেন, আন্দোলনকারীদের কাউকে গ্রেপ্তার করো না। এ কথা বলার পর ফেনী, লক্ষ্মীপুর, পিরোজপুর, লালমনিরহাটে বিএনপির কর্মসূচিতে হামলা করেছে যুবলীগ-ছাত্রলীগ। রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদকে রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার ও পুলিশের এসপি নানাভাবে হয়রানি করছেন।