বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। এ উপলক্ষে দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
দেশে বিএনপির চেয়েও পুরোনো অনেক দল আছে। কিন্তু এই দলটি যখন গঠিত হয়েছিল তখন পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে দেশের সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একটি জাতীয় দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয় জাতীয় সংসদে; চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের যুব সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠনও বিলুপ্ত হয়। 'বাকশাল' নাম দিয়ে সেই জাতীয় দল গঠন করা হয়। এ পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পট পরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ক্ষমতায় যারা আসীন হয় তারাও আওয়ামী লীগেরই নেতৃবৃন্দ। ১৫ আগস্টের আগের মন্ত্রিসভার বড় অংশ দিয়েই সরকার গঠিত হয়। আগের সংসদই বহাল ছিল; স্পিকারও বহাল ছিলেন। আগের সরকারে যারা ছিল, তারাই বহাল থাকে। পরিবর্তন ঘটেছিল মূলত সরকারপ্রধানের।
১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। ৩ নভেম্বর একটি ক্যু সংঘটিত হয়। সেখানে খন্দকার মোশতাকের জায়গায় প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে বসানো হয়। খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনী প্রধান হন। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়ং। সংসদ বাতিল করা হয়; মন্ত্রিপরিষদও বাতিল করা হয়। এসব ঘটনা ঘটে যায় দুই-তিন দিনের মধ্যে। মনে রাখতে হবে, জিয়াউর রহমান তখনও গৃহবন্দি।
এর পর ৭ নভেম্বর প্রভাতে সাধারণ জনগণ ও সৈন্যরা গৃহবন্দি থেকে দেশের সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। জনগণ আনন্দের সঙ্গে সিপাহি জনতার বিপ্লবকে বরণ করে। সিপাহি এবং জনতার সম্মিলনে এক নতুন মাত্রা যোগ হয় দেশের ইতিহাসে।
সে সময়টা এমন ছিল যে, সব বাহিনী, সমাজ, দেশ- কোথাও কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নব্য স্বাধীন দেশে অনেক কিছুই ছিল বিপজ্জনক; কঠিন। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ করে জিয়াউর রহমানের যে বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল, সেটা ব্যবহারের মাধ্যমে কেউ কেউ ক্ষমতা গ্রহণের চক্রান্তও করেন সে সময়। কিন্তু সেদিন তিনি সব চক্রান্ত প্রতিহত করে দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি বিপ্লব বা বিদ্রোহ করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাননি।
জিয়াউর রহমান উন্নয়ন ও অগ্রগতির মন্ত্র দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। জনগণ তাঁকে বিশ্বাস করেছে। তখন থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত বেশকিছু যুগান্তকারী কাজ তিনি সম্পন্ন করেছিলেন। তার একটা হলো বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন।
বিএনপি গঠন একদিনে হয়নি। প্রথমে 'জাগদল' গঠিত হয়। বিচারপতি সায়েম ছিলেন এর আহ্বায়ক। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ছাড়াও যাঁরা কখনও রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তাঁরাও এতে যোগ দেন। পরে জাগদল, ভাসানী ন্যাপ, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ লেবার পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় 'জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট'। সেই ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবেই জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন। এর আগেই তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। দেশকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মর্যাদাকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ছিল এ কর্মসূচি।
রাষ্ট্রপতি পদে বিজয়ী হওয়ার পর জিয়াউর রহমান চিন্তা করলেন, আরও ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। সেই বিএনপি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে।
ওই সময় আর কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। বাকশালের বিলুপ্তি ঘটে তাদের প্রধান নেতা নিহত হওয়ার পর থেকেই। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পর ইসলামপন্থিদের রাজনীতিও ছিল না। জিয়াউর রহমান সবার রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আর গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে সবাই দেশের জন্য কাজ করতে পারবেন বলে তিনি একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশিদের সুস্পষ্ট একটা পরিচয় দেন 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'। তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। দুর্নীতি, অনাচার বন্ধ করেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় নিয়ে যান। খাল খনন করে দেশের কৃষিকাজে বিপ্লব ঘটান। বিএডিসি গঠনের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার, বীজ, কীটনাশক সুষ্ঠু বিতরণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বন্ধ শিল্প চালুর পাশাপাশি নতুন শিল্প গড়ে তোলেন। কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটানো হয়। উৎপাদন বাড়ানো হয়। জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই দেশে গার্মেন্ট শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনিই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে সাড়ে আট হাজার জনশক্তি রপ্তানি করেন। পল্লী বিদ্যুতায়নের প্রথম উদ্যোগ নেন। বাপেক্স গঠন করেন এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ রপ্তানি শুরু করেন। যুব ও নারীশক্তি সমৃদ্ধ করতে যুব ও নারী মন্ত্রণালয় গঠন করেন। বস্তুত জিয়াউর রহমান উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির মন্ত্র দিয়ে বিএনপি গঠন করেন। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকার যে উন্নয়ন করেছে; তার সঠিক মূল্যায়ন ও সম্মান জানানো জরুরি।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর অনেকেই মনে করেছিল, বিএনপি ধসে যাবে। কিন্তু ধসেনি। তাঁর অনুপস্থিতিতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দায়িত্ব নিয়েছেন। আপসহীনভাবে স্বৈরাচারী সরকারকে হটানোর জন্য দীর্ঘ ৯ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন; দলকে দুই দফা ক্ষমতায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু জনগণ ভালোবাসে বলেই তাঁকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও দেশ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। কিন্তু তিনি দূর থেকেই সঠিকভাবে বিএনপি পরিচালনা করছেন। আমরা তাঁর নেতৃত্বেই ঐক্যবদ্ধ আছি।
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে বিএনপি নেতাকর্মীদের গুম-খুন করে, হামলা-মামলা দিয়েও দলের মধ্যে কোনো বিভক্তি তৈরি করা যায়নি। বস্তুত জনগণের সমর্থন থাকলে কোনো দলকে বিভক্ত বা বিলুপ্ত করা সম্ভব না। বিএনপিকে বিলুপ্ত করা সম্ভব না, বিভক্তও করা যাবে না। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জনগণের সমর্থন নিয়েই বিএনপি টিকে রয়েছে। সামনের দিনগুলোতেও এগিয়ে যাবে।
নজরুল ইসলাম খান: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য