চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ছাত্রলীগের ১৮ জন নেতা ২৮ হাজার শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে রেখেছেন। এসব নেতার খামখেয়ালিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। কমিটিতে পদ-পদবি পাওয়া না পাওয়া ছাত্রলীগের দলীয় বিষয়। এটিকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। তাঁরা যখন ইচ্ছে অবরোধ ডাকেন, টায়ার জ্বালিয়ে প্রধান ফটকে তালা মারেন। তাঁদের নির্দেশে বন্ধ করে দিতে হয় ক্লাস ও পরীক্ষা। চবি অচল করতে ইচ্ছে হলেই তাঁরা বন্ধ রাখেন শাটল ট্রেন। মন চাইলে অপহরণ করেন শাটল ট্রেনের চালককে। তাঁদের ভয়ে তটস্থ থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চবির রেজিস্ট্রার এসএম মনিরুল হাসান সমকালকে বলেছেন, 'এসব ছাত্রনেতার ইচ্ছার কাছে জিম্মি ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। তাঁদের বিরুদ্ধে এবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' রেজিস্ট্রার এবার কী ব্যবস্থা নেন, তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। তবে এতদিন কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না সে জবাব উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেবেন কি? ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর স্বার্থে এ রকম ৮ জনের ছাত্রত্ব বাতিল করলে অনেক আগেই চবি রাহুমুক্ত হতো। চবি ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এই ৮ নেতার বিরুদ্ধে তারা কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয় ভর্তি হন। পাঁচ বছরের কোর্স ১১ বছরেও শেষ করেননি এই আদুভাই। পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকলেও খুন, মারামারি, হল দখলে বেশ সিদ্ধহস্ত তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে আছে খুনের মামলাও। জামিনে থেকেই এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি পদের গরমে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছেন তিনি। এ প্রদীপরা আলো না ছড়িয়ে সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্ধকার ডেকে আনেন। যেখানে অনার্স-মাস্টার্স পড়তে ৫ বছর লাগার কথা, সেখানে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে ১১ বছর পড়ছেন তার খোঁজ-খবর করাটা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতারা প্রয়োজন মনে করেছেন?

কমিটি সম্প্রসারণের দাবিতে চবিতে সর্বশেষ অবরোধ হয়েছে গত সোমবার। এতে ১১টি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় ৪৮টি বিভাগ ও ৬টি ইনস্টিটিউটের শতাধিক ক্লাস। এর দেড় মাস আগে আরেক দফা অবরোধে স্থগিত হয় ৯টি বিভাগের ১১টি শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা। মাত্র ১৩ জন নেতার কথায় তাঁদের ৫০-৬০ জন অনুসারী অচল করে দিচ্ছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা জানি, একসময় শিবিরের ক্যাডাররা চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাস চালিয়েছে। স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের রাহু থেকে ক্যাম্পাস মুক্ত হয়েছে, এটা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণকারী ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর আচরণে সংগঠনের ভাবমূর্তি ম্লান হচ্ছে।

এদিকে ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ইডেন কলেজ ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংগঠনটির কলেজ শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে সিট বাণিজ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলায় একজন সহসভাপতির ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের শিকার সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের আওতায় আনার আলটিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এর আগে বেশ কয়েকবার ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হয়। এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলার সময় বিকৃতরুচির পরিচয় দেওয়া রিভা পরে ক্ষমাও প্রার্থনা করেছেন। ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে কেন্দ্রীয় সহসভাপতি তিলোত্তমা সিকদার ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেনজির হোসেন নিশিকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি কী রিপোর্ট দেয় আর সংগঠন কী ব্যবস্থা নেয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটির দ্বিতীয় জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এর আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রয়েছে সোনালি অতীত। সম্প্রতি নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে সংগঠনটি বারবার সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। এসব কারণে আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষনেতাও সংবাদমাধ্যমের ওপর বিরক্ত। তাঁদের অভিযোগ, পান থেকে চুন খসলেই সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে যায় ছাত্রলীগ। কিন্তু পান থেকে চুন খসলেই যেসব ছাত্রনেতা অমানবিক আচরণ করেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে, তা অবশ্যই সংবাদমাধ্যমে ইতিবাচক হিসেবে আসত। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, ইডেন কলেজে গত দুই মাসে যেসব ঘটনা ঘটেছে সে ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ যদি সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারত তাহলে এখন উত্তাপ ছড়াতো না। বরং নীতিনির্ধারকদের নিষ্ফ্ক্রিয়তা, স্বজনপ্রীতি ও গ্রুপিংয়ের বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দলের পদ-পদবি নিয়ে বিরোধে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা হলে একদিকে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়; সেই আতঙ্ক অভিভাবকদের জন্যও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।