বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা ৫৪ দল ও সংগঠনের অনেকেই সরকারের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর ওরফে ভিপি নুর। তিনি বলেন, বিরোধী জোটের শরিকদের কেউ কেউ সরকারের সঙ্গেও লিয়াজোঁ করছেন এবং আসন ভাগাভাগি করে ঐকমত্যে পৌঁছে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে জোটের মধ্যে টানাপোড়েন স্বীকার করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চের মধ্যে অসন্তুষ্টি রয়েছে। সমমনাদের প্রতি বিএনপির আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। বিষয়গুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান না করলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বুধবার দলীয় কার্যালয়ে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ভিপি নুর। এ সময় চলমান রাজনীতি, সরকারবিরোধী আন্দোলন, জোট ও দল নিয়ে খোলামেলা সব প্রশ্নেরই উত্তর দেন তিনি। অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি এবং বিরোধী জোটের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করতে। এমনকি কিছু দল ও জোট এবং নেতাকে সরকার নিজের পক্ষে টেনে জনমনে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ-সংশয় তৈরি করতে চাচ্ছে।

সমকাল :অনেকে মনে করেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আপনার একটি মাত্রায় জনপ্রিয়তা রয়েছে, আবার কিছু সন্দেহও রয়েছে। আপনি কী বলেন?

ভিপি নুর :প্রকৃত রাজনীতিবিদকে ঘিরে কিছু রহস্য ও আকর্ষণ থাকে। রাজনীতিবিদ হিসেবে কিছু আকর্ষণ ধরে রাখতে হয়। নানা প্রতিকূল অবস্থায় ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচনে দল-মত নির্বিশেষে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছি। তারপর থেকে দল-মত না দেখেই ইতিবাচক কাজ করছি। এটা ঠিক যে, কিছু মানুষ নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর কথা বলে থাকেন। সে সরকারের লোক, আবার কেউ বলেন- সে বিরোধী দলের লোক। প্রত্যেককে কি ধরে ধরে বোঝানো সম্ভব- আমি সরকারের লোক, নাকি বিরোধী দলের লোক?

সমকাল :জোট গঠন হতে না হতেই গণতন্ত্র মঞ্চে টানাপোড়েনের খবর আসছে। আপনাকে নিয়েও নানা সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে।

ভিপি নুর :এটা ঠিক যে, গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে আমাদের কাজ করার ক্ষেত্রে একটি অসন্তুষ্টি তৈরি হয়েছে। সেটি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মঞ্চের অনেকে বাম ঘরানার রাজনীতি করেছেন। কাজেই তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশনেরও একটু পার্থক্য আছে। আমরা উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাই। দেশের ৯০ ভাগ মুসলমান। ধর্মভিত্তিক যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে- আমরা তাদের সমর্থন করি বা না করি রাজনীতিতে তারা ফ্যাক্টর। সেগুলোর মধ্যে জামায়াত, চরমোনাই এবং হেফাজতসহ অনেকগুলো দল রয়েছে। আমরা বাম-ডান- সব দলকে এই প্ল্যাটফর্মে নেব। কিন্তু আমি দেখেছি, গণতন্ত্র মঞ্চে ইসলামপন্থি দলের ব্যাপারে শরিক দলগুলো ইতিবাচক নয়। তাহলে বামপন্থি ট্যাগ নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চে থাকব- এটা তো আমাদের জন্য বিব্রতকর। সরকার ও বিরোধী দলের অনেকেই আমাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে অনেক কিছু করতে চায়; সে জায়গায় আপত্তি থাকে।

সমকাল :সকালে জোটের কর্মসূচিতে অল্প কয়েকজন নেতাকর্মীর উপস্থিতি, বিকেলে নিজেদের দলীয় কর্মসূচিতে বিশাল শোডাউনের নেপথ্যে কারণ কী?

ভিপি নুর :বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলিনি যে, মঞ্চের কর্মসূচিতে এসে বক্তব্য দেব। কিন্তু মঞ্চের নেতৃবৃন্দ তড়িঘড়ি করে কর্মসূচি শেষ করে দিলেন- যাতে আমি বক্তব্য রাখতে না পারি। এটি আমাদের নেতাকর্মীদের খুবই ক্ষুব্ধ করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের সম্মানের সঙ্গে কথাগুলো বলছি, তাঁদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে এবং অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তাঁদের অনেকের দলের সাংগঠনিক অবস্থানটা এতটা শক্তিশালী নয়। সে ক্ষেত্রে গণঅধিকার পরিষদের কিছুটা হলেও সেই অবস্থান তৈরি হয়েছে। যে দল থেকে সমাবেশে ২০ জন কর্মী আসে, তারাও তিনজন বক্তব্য দেন; আর যাদের ৫০০ বা হাজার কর্মী আসে, তাদেরও তিনজন বক্তব্য দেবেন। এটা আমরা প্রকাশ্যে বলতে চাইনি। আশা করি, গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা আমাদের অসন্তুষ্টির জায়গাটি খুঁজে বের করে আগামীতে কীভাবে নিজেদের ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে পারি- সে চেষ্টা করবেন। আর জোটকে সাত দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ১৭ দল ও সংগঠনকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়- সে বিষয়টি ভাববেন। আমি খোলামেলা বলি। অনেকে ভেতরে ভেতরে বলেন বা বলেন না। জোটের শরিকদের কেউ কেউ সরকারের সঙ্গেও লিয়াজোঁ করছেন এবং টাকা-পয়সা নিচ্ছেন।

সমকাল :কারা সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করছে বা টাকা-পয়সা নিচ্ছে?

ভিপি নুর :বিএনপির সঙ্গে যে ৫৪ দল ও সংগঠন রয়েছে, তাদের অনেকের ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বোঝাপড়া হয়ে গেছে। এটা বিএনপি খুঁজে বের করুক। আমি এজন্য খোলামেলা বলছি, নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ছোট দলগুলোর যেভাবে কদর করছে- কাউকে পূর্বাচলে প্লট দেওয়ার অফার দিচ্ছে, কাউকে দুটি আসন দেবে, কাউকে সংগঠন চালানোর জন্য টাকা দিচ্ছে ইত্যাদি। আমরা জানি, বিএনপি নির্যাতিত দল। তারা আসন বা টাকা দিতে না পারুক- তাদের দিক থেকে দলগুলোর সঙ্গে আন্তরিকতা দরকার ও সমন্বয় দরকার। সেদিক থেকে বিএনপি পিছিয়ে আছে। আমি চাই, বিএনপির উপজেলা, জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতারা সবাই বিষয়টি অনুভব করুন।
সমকাল :এই মান-অভিমান ও ক্ষোভ থেকে শেষ পর্যন্ত কি জোট ভাঙনের মুখে পড়বে?

ভিপি নুর :আমার মনে হয় না। নির্বাক বন্ধু অপেক্ষা স্পষ্টবাদী শত্রু অনেক ভালো। বিষয়টি আমলে নেওয়া প্রয়োজন।

সমকাল :আপনাদের এই ঘোলা পানিতে অন্য কেউ মাছ শিকার করবে না তো?

ভিপি নুর :আমি বলতে শুরু করেছি। আরও দু-একজন বলুক। তাহলে অন্যরা অনুভব করবে- আমাদের এই বিষয়গুলো সমাধান করে সামনে এগোতে হবে। একই সঙ্গে সরকার যে একটা ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে, এটা একেবারে অস্বীকার করা যাবে না।

সমকাল :ওয়ান-ইলেভেনের মতো আবারও কিংস পার্টির তৎপর হয়ে ওঠার গুঞ্জন রয়েছে।

ভিপি নুর :আমি শুনেছি, সরকারের কিছু এজেন্সি বিএনপির সাবেক কিছু নেতা যাঁরা মনোনয়নবঞ্চিত ও পদবঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে কিংস পার্টি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আমার মনে হয় এতে হালে পানি পাওয়া যাবে না।

সমকাল :অনেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সংকটের কথা বলেন। আপনাদের আন্দোলনের ফলে ভবিষ্যতে পরিবর্তন ঘটলে...।

ভিপি নুর :খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বিএনপির বলা উচিত, মির্জা ফখরুলই বিএনপির শীর্ষ নেতা। বিএনপি ক্ষমতায় এলে মির্জা ফখরুল হবেন প্রধানমন্ত্রী। দল পরে সিদ্ধান্ত নেবে, কে আসবে।

সমকাল :ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বিএনপিসহ বিরোধী দলের সাক্ষাৎ না হওয়ার বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ভিপি নুর :লুর সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সঙ্গে বিএনপির বৈঠক হয়েছে কি হয়নি, তা মিডিয়া নাও জানতে পারে। তা ছাড়া মার্কিন দূতাবাসের সব রিপোর্ট তাঁর এবং বাইডেন প্রশাসনের কাছে আছে।

সমকাল :ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনারের সঙ্গে মঙ্গলবার আপনার বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে?

ভিপি নুর :বাংলাদেশের জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। অন্য দলগুলোর মতো আমরা বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার বিষয়ে আলোচনা করেছি।

সমকাল :ইসরায়েলের গোয়েন্দার সঙ্গে ছবি ভাইরালের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ভিপি নুর :এই ছবিটি এডিট করা। ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সরকারি দলের সমর্থকরা অপপ্রচার করেছে।

সমকাল :সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ভিপি নুর :আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিষয় : সাক্ষাৎকার: ভিপি নুর

মন্তব্য করুন