নির্বাচন ছাড়াই জাতীয় সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানোর বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনের বক্তব্য ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। মঙ্গলবার বিকেলে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জিনাত হুদা এ দাবি করেন।

তবে অধ্যাপক আ ক ম জামালের অভিমত, তিনি সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে গবেষণালব্ধ বক্তব্য দিয়েছেন।

গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘হত্যার হুমকির’ প্রতিবাদে মানববন্ধনের আয়োজন করে ঢাবি শিক্ষক সমিতি। এ সময় অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, পাঁচ বছর না হোক অন্তত দুই বছর জাতীয় সংসদের মেয়াদ বাড়ানো যেতেই পারে। করোনা দুর্যোগের কারণে জাতীয় সংসদ দুই বছর ঠিক মতো কাজ করতে পারেনি। তাঁর এমন বক্তব্যে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।

এমন প্রস্তাবকে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল সমকালকে বলেন, ‘সংবিধানের ১২৩নং অনুচ্ছেদে রয়েছে, কোনো দৈব দুর্বিপাকের কারণে ইলেকশন (নির্বাচন) না করতে পারলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে তা করতে হবে। এটা ছাড়া আর কোনো বিধান নেই। কাজেই এমন ব্যক্তব্য কোনোভাবেই সংবিধান সমর্থিত করে না। এই প্রস্তাব অসাংবিধানিক ও গণতন্ত্রবিরোধী নয়। এটা একটা ‘উদ্ভট’ প্রস্তাব।

এ বিষয়ে ঢাবি শিক্ষক সমিতির অবস্থান ব্যাখ্যা করে জিনাত হুদা বলেন, শিক্ষক সমিতির অবস্থান পরিষ্কার। শিক্ষক সমিতি মানববন্ধন অথবা সমাবেশ করলে সেখানে সব মতের শিক্ষকরা আসেন। সুতরাং ড. জামাল যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত। এই বক্তব্যের সঙ্গে শিক্ষক সমিতির কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি শিক্ষক সমিতির কার্যকরী কোনো সদস্যও নন।

তিনি বলেন, সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষক সমাজ সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ভূমিকা রেখেছেন। আগামীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সেই নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে জনগণ যাকে রায় দেবে, তারাই সরকার গঠন করবে। এটাই তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

এমন বক্তব্যের কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, নির্বাচন করার মত অর্থনৈতিক অবস্থা বাস্তবে আমাদের নেই। করোনা মহামারিতে অর্থনীতির ধরাশায়ী অবস্থা। লাখ লাখ লোক বেকার। কোনোরকম জীবন চালিয়ে নিচ্ছে। নানা সঙ্কট তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চৌকশ নেতৃত্বের কারণে কিছুটা উতরায়ে গেছে। এখনও তো ঝুঁকি আছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ব্যয় দুই হাজার কোটি টাকা। অনানুষ্ঠানিক ব্যয় কমপক্ষে পঞ্চাশ থেকে এক লাখ কোটি টাকা। কারণ প্রার্থীরা সমর্থকরা যে পরিমাণ টাকা ইলেকশনের (নির্বাচন) জন্য খরচ করেন, তা পুরোটায় অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ। একজন প্রার্থী পাঁচ কোটি টাকা নির্বাচনে ব্যয় না করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে করলে পাঁচটা লোক চাকরি পাবে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে আ ক ম জামাল বলেন, ‘নির্বাচনের সময়, আমাদের একজন নেতা লন্ডনে আছে, তার কাছে শতশত লোক যাচ্ছেন। ফরেন কারেন্সির উপর তো একটা ক্রাইসিস তৈরি হবে। নির্বাচনের সময় লন্ডন থেকে নমিনেশন আসে। পাঁচজন প্রার্থী যদি লন্ডন যান, প্রত্যেকে টাকা পয়সা নিয়ে যাবেন। সেখান থেকে তো নিয়ে আসবেন না।’

তিনি বলেন, তারা চায় (বিএনপি) আমার ইলেকশনে যেতে হবে তালগাছের জন্য। তালগাছ তো পাবে না। তখন তারা মারামারি করে জেলে ঢুকবে। আমেরিকার পত্রিকা গবেষণা করে প্রতিবেদন দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মত ক্ষমতায় আসবেন। দেশের ভেতরও আপনারা দেখতেছেন, একটা গণ্ডির বাইরে তারা (বিএনপি) খুব একটা আসতে-যেতে পারছে না। তারা ইলেকশন করে জিতে আসবে?

ঢাবির এই অধ্যাপক আরও বলেন, নির্বাচনে সোহাদ্যপূর্ণ পরিবেশের কোনো চিহ্ন নেই। এখানে হানাহানি-কাটাকাটি করলে তো একটা থানা, দুই-চারশ পুলিশ দিয়ে কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। ফলে সুশীল সমাজের অংশ হিসেবে, যেখানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি হতে পারে সেখানে আমরা কথা বলতেই পারি। কথা বলা উচিত।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ঠিক ইলেকশনের সময় যদি করোনার প্রভাব থাকতো, যখন লোকজন বের হতে পারছে না, তখন এরকম কথা প্রাসঙ্গিক হতো। তখন হলে কিছুদিন বাড়ানো যেত বা কিছু করা যেত। এখন লোকজন অবাধে চলাচল করতে পারছে। এখন তো প্রশ্নই আসে না। আর স্থানীয় পরিষদ, উপনির্বাচন হচ্ছে সেখানে জাতীয় নির্বাচনে বাধা কোথায়?

আসিফ নজরুল বলেন, আরেকটা বিষয় মনে পড়ছে, ১৯৭৫ সালে যখন বাকশাল কায়েম করা হয়, তখন জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই সংসদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে যদি এই ধরনের চিন্তাও থাকে, তাহলে মনে রাখা উচিত এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আমাদের সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।