ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

'স্বৈরাচার পতন দিবস' আজ

তিন জোটের রূপরেখা কেউ মনে রাখেনি

তিন জোটের রূপরেখা কেউ মনে রাখেনি

অমরেশ রায় ও কামরুল হাসান

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৪:২৬

স্বৈরাচার ও সামরিক একনায়ক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতন হয় '৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। গণঅভ্যুত্থানে ওই সরকারের পতনের আগেই তিন জোটের রূপরেখা তৈরি হয়। স্বৈরাচারের পতনের পর পরবর্তী সরকারব্যবস্থা কেমন হবে- সেটাই ছিল রূপরেখার মূল কথা।

গণতন্ত্রে ফেরা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর করাসহ অনেক দিকনির্দেশনার সেই রূপরেখা পরে আর কেউ মনে রাখেনি। তিন জোটের মূল অঙ্গীকারের অনেকটাই এখনও উপেক্ষিত। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের যে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটা কিছু কিছু পর্যায়ে বহাল রয়েছে। সামরিক স্বৈরশাসকের ক্ষমতায়নের পথও রুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের লক্ষ্য এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় আজ সোমবার দেশে ঐতিহাসিক ৬ ডিসেম্বর 'স্বৈরাচার পতন দিবস' পালিত হচ্ছে।

স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর থেকে দিবসটিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা নামে পালন করে আসছে। দিনটিকে আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস', বিএনপি 'গণতন্ত্র দিবস' এবং এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি 'সংবিধান সংরক্ষণ দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে। যদিও কালের পরিক্রমায় দিবসটি উপলক্ষে বড় বড় রাজনৈতিক দল তেমন কোনো কর্মসূচি পালন করে না। এর পরও কোনো কোনো সংগঠন দেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিনটি ঘিরে কিছু ঘরোয়া কর্মসূচি পালন করবে।

তিন জোটের রূপরেখা ও স্বৈরশাসন অবসানের প্রেক্ষাপট: ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল এবং বামপন্থিদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ দল মিলে এরশাদ-পরবর্তী সরকারব্যবস্থা কী হবে- তার একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল। ওই বছর ১৯ নভেম্বর ওই তিনটি জোট আলাদাভাবে সেই রূপরেখা তুলে ধরে। তিন জোটের বাইরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী তখন যুগপৎ আন্দোলনে শামিল ছিল। এর পর তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে তুমুল গণআন্দোলন শুরু হয়। দেশজুড়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দল ও সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সর্বাত্মক ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়। এরশাদশাহি তার পতন ঠেকাতে সান্ধ্য আইনের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ ছাড়াও দেশজুড়ে দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও হত্যার পথ বেছে নেয়। অবশেষে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৪ ডিসেম্বর রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিলে সারাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে। ৬ ডিসেম্বর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করে তার নেতৃত্বে গঠিত 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার'-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এরশাদ বিদায় নেন।

কী ছিল তিন জোটের রূপরেখায়: তিন জোটের ঐতিহাসিক রূপরেখার প্রধান দিক ছিল মৌলবাদ ও স্বৈরাচার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে- সে প্রত্যয়। ছিল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। ফলে ওই রূপরেখাকে কেউ কেউ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে 'জাতীয় সনদ' বলেও মনে করেন।

রূপরেখায় জাতীয় সংসদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে ভোটারদের ইচ্ছামতো ভোট দেওয়ার বিধান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে আবারও গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল রূপরেখায়। আরও কিছু ধারা-উপধারায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠাসহ আরও কিছু অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছিল।

এ ছাড়া তিন জোটের তুমুল আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর 'রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আচরণবিধি' নামে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর হয়েছিল, যেটি জনসমক্ষে প্রকাশও করা হয়। সেই অঙ্গীকারনামার ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়, 'আমাদের তিনটি জোটভুক্ত দলসমূহ ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা এবং অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকবে। আমাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহ সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় প্রদান করবে না। এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা সমবেতভাবে প্রতিরোধ করবে।'

৪ নম্বর ধারায় বলা হয়, '...স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের চিহ্নিত সহযোগী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের আমাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহে স্থান না দেওয়ার জন্য আমাদের ইতোপূর্বে প্রদত্ত ঘোষণা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।'

রূপরেখা বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতটুকু: তিন জোটের রূপরেখা কী- দেশের নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগই সেটা জানে না। রাজনীতি সচেতন অনেকেও এখন ওই রূপরেখার কথা ভুলে গেছেন। আবার রূপরেখায় বর্ণিত মূল অঙ্গীকারগুলো পরবর্তী সরকারগুলোর সময় মানা হয়নি- এমন অভিযোগও সর্বজনবিদিত।

তিন নেতার তিন মূল্যায়ন: 'স্বৈরাচার পতন দিবস' সামনে রেখে সমকাল কথা বলেছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তিন অগ্রসৈনিক তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের তিন শীর্ষ নেতা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এমপি, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য নুর আহমদ বকুলের সঙ্গে।

অসীম কুমার উকিল বলেন, তিন জোটের রূপরেখা পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে- এটা বলা যাবে না। এটা সময়সাপেক্ষ একটা ব্যাপারও। তবে মোটাদাগে বলা যায়, রাতের আঁধারে ক্ষমতা দখলের বদলে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল, অর্থাৎ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সরকার গঠনের দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে। যদিও মাঝখানে কারও কারও চোখ রাঙানিতে ওয়ান-ইলেভেন এসেছিল। কিন্তু জনগণ রুখে দাঁড়িয়ে সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের পৃথককরণ এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন, অবাধ ও মুক্ত তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠাও হয়েছে। তবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের কাজটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও সেটা করার প্রচেষ্টা রয়েছে।

নব্বইয়ের গণভ্যুত্থানে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আমান উল্লাহ আমান বলেন, যে গণতন্ত্র ১৯৯০ সালে পুনরুদ্ধার হয়েছিল এবং যে গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছিল; সেই গণতন্ত্র আজও অবরুদ্ধ, নিষ্পেষিত। সেই গণতন্ত্র আজ একদলীয় শাসনে এবং ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী পর্যায়ে রয়েছে। যে উদ্দেশ্য সামনে রেখে সেদিন জনগণ আন্দোলন করেছিল, সংগ্রাম করেছিল এবং যারা শহীদ হয়েছিল, যারা আত্মাহুতি দিয়েছিল; আজও তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আজকে এ পরিস্থিতিতে অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হলে; গণতান্ত্রিক সরকার কায়েম করতে হলে সবার আগে ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আরেক নেতা ও বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর প্রাক্তন সভাপতি নুর আহমদ বকুল বলেন, তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী গণতন্ত্র তথা সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে- এটা ঠিক। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চালু আজও সম্ভব হয়নি। মানুষের ভোটের অধিকার আবারও হারিয়ে গেছে। দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠার বদলে লুটেরা রাজনীতি তথা লুটপাট ও শোষণের অর্থনীতি চালু হয়েছে। বৈষম্যও অনেক বেড়েছে।

তিনি বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়কালে দেশের উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, মাথাপিছু আয় ও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি বেড়েছে- এগুলো ঠিক। কিন্তু সমাজে চরম বৈষম্য বিদ্যমান থাকায় এর কোনো সুফল মিলছে না। আরেকটি বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এবং মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আঁতাত ও আপস অনেক বেড়েছে। এক দল জামায়াতের সঙ্গে, আরেক দল হেফাজতের সঙ্গে আঁতাত করে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান তথা তিন জোটের রূপরেখার চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান।

আরও পড়ুন

×