চট্টগ্রামে নালা, ফুটপাত, যাত্রী ছাউনি, উদ্যান ও পার্কিংয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে দোকান। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে এসব দোকান নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সদ্য বিদায়ী মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে দোকান নির্মাণে জায়গাগুলো ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা পেয়েছেন নগর আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে, যুবলীগ নেতা, পরিবহন মালিক সমিতি, বিনোদনমূলক সংগঠন ও সাংবাদিক। এমনকি একটি কাপড়ের দোকানকেও সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অপরিকল্পিত এসব কাজে নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সমাজের আপত্তিকেও আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে সংকুচিত হয়েছে হাঁটার পথ। নষ্ট হয়েছে উদ্যানের প্রাকৃতিক শোভা। বেড়েছে যানজট ও জলজট। এতে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ববঞ্চিত হয়েছে সিটি করপোরেশন।

এ প্রসঙ্গে চসিকের নবনিযুক্ত প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, 'সৌন্দর্যবর্ধনের সঙ্গে দোকানের কী সম্পর্ক, তা মাথায় আসছে না। অথচ সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ফুটপাতসহ যত্রতত্র দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। এসব জায়গা বরাদ্দেও কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। এসব জায়গা দেখভালের দায়িত্ব এস্টেট বিভাগের হলেও তাদের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। জায়গাগুলো বরাদ্দে অনিয়ম-ত্রুটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে আইন বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিগগির অবৈধ দোকানগুলো উচ্ছেদ করা হবে।' দায়িত্বে অবহেলার দায়ে ইতোমধ্যে রাজস্ব বিভাগে গণবদলিও করা হয়েছে।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়নের জন্য নগরের ৪১টি এলাকা ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানকে একাধিক এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গা বরাদ্দে কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রস্তাবনা উপস্থাপনার মাধ্যমে ফুটপাত, সড়ক বিভাজক ও উদ্যান বরাদ্দ দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের জায়গা দেখভালের দায়িত্ব এস্টেট বিভাগের হলেও বরাদ্দ দিয়েছে নগর পরিকল্পনা শাখা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সিটি করপোরেশনের পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রায় সব চুক্তিতে সাক্ষী ছিলেন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ একেএম রেজাউল করিম ও ভূ-সম্পত্তি (এস্টেট) কর্মকর্তা এখলাস উদ্দিন আহমদ। ইজারার বিনিময়ে বার্ষিক নামমাত্র কর পাচ্ছে সিটি করপোরেশন, যার সর্বনিম্ন পরিমাণ ৩০ হাজার; সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা।

চসিকের জায়গায় ব্যক্তির ব্যবসা : সরেজমিন নগরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সিটি করপোরেশনের ফুটপাত-নালার ওপর দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল স্ট্ক্রিনের নামে বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্যও ভাড়া দেওয়া হয়েছে। জামালখান মোড়ে যাত্রী ছাউনিতে চারটি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। একই এলাকায় পিডিবি কলোনির পাশে নালার ওপর দোকান নির্মাণ করে অ্যাকুয়ারিয়ামের দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নগরের আমতল মোড়ে ফুটপাতে খাবারের দোকান, ওআর নিজাম রোডের পাশে ফুটপাতে দোকান নির্মাণ করে রেস্তোরাঁ ও ওষুধের দোকান হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নগরের ২ নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যানে ঢাকার রিফর্ম লিমিটেড ও চট্টগ্রামের স্টাইল লিভিং আর্কিটেক্টসকে ২০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। উন্মুক্ত এই উদ্যানে আধুনিকায়নের নামে প্রাকৃতিক শোভা বিনষ্ট করে দ্বিতল বিপণিবিতান নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ২৫টি দোকান রয়েছে। এ ছাড়া নগরের আমতলের শাহ আমানত সুপার মার্কেটের গাড়ি রাখার জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে দোকান। ষোলশহর শপিং কমপ্লেক্সের উন্মুক্ত স্থানেও দোকান নির্মাণের কাজ চলছে। দুটি বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদকেও পাত্তা দেননি সিটি করপোরেশনের কর্তারা।

সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ একেএম রেজাউল করিম বলেন, 'যথাযথ নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যেভাবে কাজ বাস্তবায়নের কথা সেভাবে করেনি। এ ধরনের দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

কাপড়ের দোকানও পেয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব : নগরের আন্দরকিল্লা মোড় থেকে লালদীঘিরপাড় পর্যন্ত সড়ক বিভাজক ও ফুটপাত সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব পায় টেরিবাজারের কাপড়ের দোকান খাজানা। প্রতিষ্ঠানটি সড়ক বিভাজকে নামমাত্র রং লাগিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে। নিজেদের প্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সড়ক বিভাজকও কেটে ফেলেছে। এ ছাড়া নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দীন চৌধুরীর ছেলে ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান এসটিডি ইন্টারন্যাশনাল ও যুবলীগ নেতা সনৎ বড়ূয়ার প্রতিষ্ঠান অ্যাড গার্ডেন যৌথভাবে তিনটি এলাকার কাজ পেয়েছে। নগরের ফয়'স লেক অ্যাপ্রোচ সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ পায় বিনোদনমূলক ও সামাজিক সংগঠন খুলশী ক্লাব। মেট্রো প্রভাতি নামে একটি বাস সার্ভিসকে নগরের মোড়ে মোড়ে বক্স কাউন্টার নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চকবাজার অলি খাঁ মসজিদ মোড় থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত ফুটপাত ও সড়ক বিভাজক সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব পেয়েছে সাংবাদিকের প্রতিষ্ঠান আলিফ অ্যাড ব্যাংক।