চট্টগ্রামের 'ফুসফুস' হিসেবে পরিচিত সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের ‘আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত’ থেকে সরে আসতে বিবৃতি দিয়েছেন চট্টগ্রামের শত নাগরিক।  শনিবার তারা যৌথভাবে এই বিবৃতি দেন। 

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিককালে পূর্ব রেলের সদর দপ্তর চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) একটি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ  নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।'

বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেন, সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন, শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফি, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম,  চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, প্রাবন্ধিক অজয় দাশগুপ্ত, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি আলী আব্বাস, একুশে পদকপ্রাপ্ত বংশী বাদক ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম, নাগরিক উদ্যোগ এর সমন্বয়কারী খোরশেদ আলম সুজন, নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি সাংবাদিক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে,ইট-পাথরের রুক্ষ-কঠিন শহরের উঁচু উঁচু দালান আর শিল্প  প্রতিষ্ঠানের ভিড়ে শতবর্ষী বৃক্ষে ঘেরা সিআরবিকে এক টুকরো অক্সিজেন প্ল্যান্ট বলা চলে। পাহাড়ের মাঝে প্রাকৃতিক শোভা মন্ডিত এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করতে গেলে শতবর্ষী অনেক গাছ কাটা পড়ার পাশাপাশি এখানকার সবুজ নিসর্গ ধ্বংস হয়ে যাবে। 

এছাড়া হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থানে রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুর রবের কবর। এই মাটি শহীদের স্মৃতিধন্য। এই সিআরবিতে অনেকে শহীদ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। রেলের অনেক শ্রমিক কর্মচারী মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন। সেইসব স্মৃতি সংরক্ষণে রেল উদ্যোগ নেয়নি। অথচ শহীদের কবর, শহীদের নামে কলোনি, শহীদের নামে যে সড়ক সেই জমি তারা বেসরকারি হাসপাতালকে বরাদ্দ দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুশাসনকে ‘কলঙ্কিত’ করার জন্য প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় ‘ষড়যন্ত্রকারী আমলা’ এই রেলের সরকারি জায়গায় বেসরকারি হাসপাতাল প্রকল্পের ‘দুঃসাহস দেখিয়েছে’ বলে অভিযোগ করেন নাগরিক ব্যক্তিত্বরা।

তারা বলেন, সিআরবি এলাকায় এই প্রকল্প স্থাপিত হলে সেটির নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রকল্পের নির্দিষ্ট স্থানেই সীমিত থাকবে না। এটি শুধু শতবর্ষী বৃক্ষ না কাটার বিষয় নয়; সময়ের প্রয়োজনে প্রকল্প এলাকা ঘিরে নতুন নতুন দালান, অবকাঠামো, দোকানপাট, পার্কিং, ফার্মেসি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের জন্য আবাসিক ভবনে ছেয়ে যাবে। যার ফলে পরিবেশ দূষণ ঘটবে এবং পুরো সিআরবি এলাকাটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বলয় হুমকির মুখে পড়বে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলেছে, সিআরবিতে যেকোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা মাস্টার প্ল্যানের লঙ্ঘন। ১৯৯৯ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে চট্টগ্রাম নগরে মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করে সরকার। সেখানে সিআরবির মতো হেরিটেজকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

এ অবস্থায়, আমরা চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলতে চাই, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বন, পাহাড় ধ্বংস করে বন্দরনগরীর ফুসফুস খ্যাত চির সবুজ সিআরবিতে শুধু হাসপাতালই নয়, কোনো ধরনের স্থাপনা করা সমীচীন হবে না। প্রকৃতি ও পরিবেশ বিনাশী সব কর্মকাণ্ডই হবে আত্মবিধ্বংসী। 

নিউইয়র্কে নাগরিক সমাবেশ-

সিআরবি রক্ষার চলমান আন্দোলন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।  এমনকি সুদূর আমেরিকায়ও চলছে সিআরবি রক্ষার আন্দোলন। 

শনিবার নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে নাগরিক সমাবেশ করেছেন চট্টগ্রামবাসীসহ বাংলাদেশীরা। হাতে 'সেভ সিআরবি' লেখা প্লেকার্ড হাতে নিয়ে বিভিন্ন বয়সের বাঙালিরা এই সমাবেশে যোগ দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এটা সরাসরি প্রচার করা হয়। সমাবেশে বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বক্তব্য রাখেন।

এ সময়তারা বলেন, দেশে হাসপতালের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যে হাসপাতাল করতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয় সেই হাসপাতাল তারা চান না। সিআরবির পরিবর্তে অন্য জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক।