চারদিকে সংকট। একটু স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের জন্য কত ব্যাকুলতা! মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এতেই ক্ষান্ত নন; করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির সৎকারের দায়ও যেন তাদের। পরিবারের অনুরোধে লাশের গোসল, কাফন পরানো থেকে সৎকার সবই করছে স্বেচ্ছাসেবী টিম। করোনা দুর্যোগের মধ্যেও ময়মনসিংহে ঝুঁকিপূর্ণ সেবায় মানুষের হৃদয়ের অনন্য উচ্চতায় ঠাঁই হয়েছে 'টিম আলী ইউসুফ'-এর।
ময়মনসিংহের মুদ্রণ ব্যবসায়ী আলী ইউসুফ। মোটাদাগে এই হলো তার পরিচয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। ছোট করে শুরু- এখন 'টিম আলী ইউসুফ'। টিম আলী ইউসুফের নামটি অবশ্য গত মাসে দিয়েছেন সদস্যরা। ক্রমান্বয়ে মানবসেবায় বেড়েছে উৎসাহী স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা। নারীরাও যুক্ত হয়েছেন এই টিমে। টিমের কাজ হচ্ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কিংবা তীব্র উপসর্গে হোম আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখতে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা দেওয়া। ময়মনসিংহ নগরীর অলিগলিতে প্রতিদিন অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে ছুটছে টিম। সকাল থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত লাশ নিয়েও চলে ছোটাছুটি। হাসপাতাল থেকে গোরস্তান কিংবা শ্মশান। মরদেহে আপনজনের মতোই পরম যত্নে শেষ বিদায় জানায় 'টিম আলী ইউসুফ'। নিজেরাই মুখাগ্নি ও জানাজা পড়ে যথাযথ মর্যাদায় মৃত ব্যক্তিকে চিরবিদায় জানান।
গত বছরের শুরুতে লড়াইটা একা শুরু করলেও টিম আলী ইউসুফের সদস্য সংখ্যা এখন বেড়েছে। বেড়েছে সক্ষমতাও। তাদের কাছে রয়েছে ৫২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার। বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও লাশ পরিবহনের জন্য গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরিফ আহমেদ টিম আলী ইউসুফকে উপহার দিয়েছেন একটি অ্যাম্বুলেন্স। একটি কার্যালয়েরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। অথচ মাত্র একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন আলী ইউসুফ। করোনাযুদ্ধে নিবেদিত আলী ইউসুফের কর্মকাণ্ড দেখে তার পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন বিভিন্ন ব্যক্তি। প্রাতিষ্ঠানিক অনুদানেও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এ টিমের।
টিম আলী ইউসুফের সহযোদ্ধা হিসেবে রয়েছেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল, আশরাফ উদ্দিন (ক্ষুদ্র অনলাইন ব্যবসায়ী), সাফরান আহমেদ (ছাত্র), মাহদী হাসান আপন (গ্রাফিক্স ডিজাইনার), অলক সরকার (ছাত্র), রাজন (চিত্রশিল্পী), তৌফিকুজ্জামান ছোটন (বাকৃবির সেকশন অফিসার), বিনায়ক দত্ত (নাট্যকর্মী), ছাব্বির আহমেদ শাকিল (গ্রাফিক্স ডিজাইনার), নাজমুল ইসলাম (ছাত্র), সুরুজ আলী (ক্লিনিকে কর্মরত), নাজমুল হুদা আরিফ (হকার), রায়হান আকন্দ (ছাত্র)। সম্প্রতি নারীদের সৎকারে যুক্ত হয়েছে চার সদস্যের নারী টিম। এর সদস্যরা হলেন- তানিয়া ইয়াসমিন (গৃহিণী), কাব্য সুমী সরকার (বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ), রোজী ইয়াসমিন (গৃহিণী) ও তাহমিনা আফরিন (ছাত্রী)।
নগরীর রহমতপুর-বাঘেরকান্দায় রয়েছে টিম আলী ইউসুফের ৬ সদস্যের টিম। রয়েছে তিন নারীসহ ১৩ সদস্যের চরাঞ্চল টিম। নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে তিন পুরুষ ও চার নারীকে নিয়ে আরও একটি টিম। ইতোমধ্যে টিম আলী ইউসুফ ৬৫টি মরদেহের সৎকার করেছে।
নারী সদস্য কাব্য সুমী সরকার শুধু শিক্ষকই নন, তিনি ডিভিশনাল ব্লাড সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। অন্তত ৪ বছর ধরে কাজ করছেন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে। ৪ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে উদ্বুদ্ধ হন করোনায় আক্রান্ত মরদেহ নিয়ে কাজ করার। তিনি সমকালকে জানান, মৃত্যুর পর ভয়ে স্বজনদের মুখও দেখতেন না তিনি। কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার পর উপলব্ধি হতে শুরু করল, তিনি আর বাঁচবেন না। বেঁচে থাকলে করোনায় আক্রান্তদের জন্য নিজেকে নিবেদিত করবেন। ওই অবস্থায় টিম আলী ইউসুফের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মরদেহ ধোয়ানোসহ অন্যান্য কাজে যুক্ত হয়েছেন।
টিম মেম্বার ৬৯ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল বলেন, জীবন মানেই যুদ্ধ। ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছি। তখন যুদ্ধ ছিল ব্যক্তি-শত্রুর বিরুদ্ধে। এখন আবার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তবে এবারের যুদ্ধ অদৃশ্য এক জীবাণুর বিরুদ্ধে। শ্মশান থেকে কবরে ছুটছি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান তিনি।
টিম আলী ইউসুফের প্রধান আলী ইউসুফ বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও পরবর্তী সময়ে সহায়তা করে যাত্রাটা শুরু করেছিলেন। যখন মৃত্যু শুরু হলো, তখন সৎকারের দায়িত্ব নিয়েছেন কাঁধে। অনেক স্থানে করোনায় আক্রান্তদের সৎকার যথাযথ মর্যাদায় না হওয়ায় শেষ বিদায়টা মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য দায়িত্ব নেন তিনি। মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখতে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ হয়ে টিমের সদস্য সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সদস্যরাই প্রধান শক্তি। মানুষের সহায়তায় তার সেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।