চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরেও বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেছিল সরকার। কিন্তু গত অর্থবছরের মতো চলতি বছর এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাননি কালো টাকার মালিকরা। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল) কালো টাকা সাদা করা থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মাত্র ১৫৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়েছে।

এনবিআরের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে ২০২০-২১ অর্থবছরে করহার ছিল ১০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং করের ওপর ৫ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপ করা হয়। যে কারণে চলতি বছর এ বিষয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এ বছর প্রধানত কিছু পেশাজীবী ও সরকারি চাকরিজীবী 'বিনা প্রশ্নে' অপ্রদর্শিত অর্থ আয়কর রিটার্নে প্রদর্শনের সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া অল্প সংখ্যক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীও আছেন এ তালিকায়।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২ হাজার ২৯৩ জন করদাতা এ সুবিধা নিয়েছেন। এসব করদাতা অপ্রদর্শিত অর্থ ও সম্পদ মিলিয়ে ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা সাদা করেছেন। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এ সুবিধা নিয়েছেন ৪৯ জন। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১ হাজার ৮৫৯ জন করদাতা মোট ২২ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা সাদা করেছেন, যা থেকে এনবিআর ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে আসছে সরকার। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিনা প্রশ্নে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয় সরকার। এত কম কর দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর সরকার চলতি অর্থবছরে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখলেও করহার বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে যোগ করে জরিমানা। পাশাপাশি বেশ কিছু শর্তও আরোপ করে। তবে জমি, ফ্ল্যাট, ভবনের বেলায় করহার বাড়ানো হয়নি এবং নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করলে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সমকালকে বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে মূলত সরকারের কোনো লাভ হয় না। এ পদক্ষেপ একদিকে অনৈতিক, অন্যদিকে অর্থনৈতিক, এমনকি রাজনৈতিকভাবেও কল্যাণকর নয়।

তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত মাত্র একবার সুযোগ দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বড় অঙ্কের কালো টাকা সাদা করতে পেরেছিল। বাংলাদেশে বারবার এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ করহারের চেয়ে কম কর দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়ে সৎকরদাতাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাঁর মতে, এবার খুব কম সাড়া পাওয়ার কারণ হতে পারে করহার বাড়ানো ও জরিমানা। কালো টাকার মালিকরা মনে করতে পারেন, সরকার আবার মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেবে।

আগামী অর্থবছরে সুযোগ রাখা হয়নি :আগামী অর্থবছরে বাজেটে দেশের ভেতরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। অর্থবিল, ২০২২-এ দেশের ভেতরে কালো টাকা সাদা করার পুরোনো বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে আয়কর আইনে কালো টাকা সাদা করার জন্য যে দুটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়, তার মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদিত এবং তালিকাভুক্ত স্টক, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড, ডিবেঞ্চার ও পুঁজিবাজারে লেনদেনযোগ্য সরকারি সিকিউরিটিজ ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ২৫ শতাংশ কর এবং করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ, আর্থিক স্কিম, সঞ্চয়পত্রসহ যে কোনো ধরনের অপ্রদর্শিত সঞ্চয় প্রদর্শনের সুযোগ আছে।

তবে আয়কর অধ্যদেশ, ১৯৮৪-এ আরও একটি নতুন ধারা যোগ করে দেশের নাগরিকদের বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা বা আয়কর রিটার্নে দেখানোর অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কোনো করদাতা তাঁর বিদেশে থাকা সম্পদ বা অর্থ দেশে নিয়ে এলে বা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করলে এ বিষয়ে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে সম্পদের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে দেখানো যাবে। বিদেশে অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে ওই সম্পত্তির ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। আর বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আনা নগদ অর্থের ওপর ৭ শতাংশ হারে কর দিয়ে তা আয়কর রিটার্নে দেখানো যাবে। এ সুবিধা আগামী ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

অপ্রদর্শিত ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট রিটার্নে দেখানো যাবে :কোনো করদাতার ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট আছে, কিন্তু আগে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করা হয়নি, তিনি আগামী অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করতে পারবেন। তবে এ জন্য তাঁকে ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টটি দেশের কোন জায়গায় অবস্থিত, তার ওপর ভিত্তি করে আয়তন অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে। যদি কোনো করদাতার ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট রাজধানীর গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় হয়, তাহলে ২০০ বর্গমিটার পর্যন্ত আয়তনের ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টে প্রতি বর্গমিটারে চার হাজার টাকা কর দিয়ে তা রিটার্নে উল্লেখ করা যাবে। আর ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের আয়তন ২০০ বর্গমিটারের বেশি হলে প্রতি বর্গমিটারে কর দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা।

আর রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকায় হলে ২০০ বর্গমিটার পর্যন্ত আয়তনে প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার টাকা এবং ২০০ বর্গমিটারের বেশি হলে প্রতি বর্গমিটারে সাড়ে তিন হাজার টাকা কর দিতে হবে। রাজধানী ও চট্টগ্রামের উল্লিখিত এলাকার বাইরে এবং অন্যান্য সিটি করপোরেশনে অবস্থিত ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হারে কর রয়েছে।