নটর ডেম কলেজ অধিকার পাবে কবে

শিক্ষাঙ্গন

১৬ মে ২০১৪

বিপ্লব ফারুক

শনিবার শিক্ষা বোর্ডগুলো এসএসসির ফল ঘোষণা করবে। এরপরই ভালো কলেজে ভর্তির জন্য ছাত্রদের শুরু হবে দৌড়ঝাঁপ। বাংলাদেশের এক নম্বর কলেজ নটর ডেমে ভর্তির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে সারাদেশ। কিন্তু সেই কলেজ এবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অস্বচ্ছ অনলাইনে ছাত্রভর্তির কবলে পড়বে। গত ৪ বছর ধরে এই অস্বচ্ছ অনলাইনে ছাত্রভর্তি নিয়মের কবলে পড়ছে। ছাত্র-অভিভাবক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে নটর ডেম কলেজের নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্রভর্তির অধিকারটুকু রক্ষার আর্জি জানিয়ে মামলা করে আসছে। হাইকোর্টও স্থায়ী নির্দেশ না দিয়ে প্রতি বছর সাময়িকী নির্দেশে কলেজে ছাত্রভর্তির অধিকার রক্ষা করে আসছেন। এর ফলে নটর ডেম কলেজ ছাত্রভর্তির বিষয়টি নিয়ে হয়রানি হচ্ছে।
নটর ডেম কলেজের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও নটর ডেম শিক্ষা ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সঙ্গে রয়েছেন ১১৫ জন ব্যারিস্টার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ অধ্যাপক। তাদের প্রিয় কলেজটির শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আইনি লড়াই থেকে শুরু করে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানা গেছে। তাদের দাবি, ৬৫ বছর ধরে নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্রভর্তি করে শিক্ষাদানে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছে, যার দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ তারা। তাদের প্রশ্ন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল-কলেজের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। ঠিকমতো পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে কিনা, এসব তদারকি করবে। অথচ শিক্ষাদানের মানোন্নয়নের জন্য কাজ না করে অস্বচ্ছ অনলাইনে ছাত্রভর্তির দায়িত্ব নেওয়াটার মূল কারণ কি ভর্তিবাণিজ্য?
এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন ক্রয় করে যারা ভালো ফল করবে, অনলাইন ভর্তির সুযোগে তারা ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারবে। আর প্রকৃত মেধাবী ছাত্র ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। নটর ডেম কলেজের ছাত্রভর্তির পদ্ধতিটা মেধাবী ছাত্র বাছাইয়ের উত্তম পন্থা। এর বিকল্প নেই। কিন্তু সেই উত্তম পদ্ধতির বাদ সেধেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন? অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সন্তান নটর ডেম কলেজে পড়তে আগ্রহী। কিন্তু নটর ডেম কলেজের স্বচ্ছ ছাত্রভর্তি পদ্ধতির জন্য তারা ভর্তি হতে পারে না। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানরা মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হতে পারছে। একবার অনলাইনে ভর্তির নিয়ম চালু করতে পারলে নটর ডেম কলেজে ভর্তিবাণিজ্যের রমরমা তদবির শুরু হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বখাটে সন্তান ভর্তি হয়ে কলেজের শান্ত অরাজনৈতিক মনোরম সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করে দেবে। ছাত্ররাজনীতি শুরু হয়ে যাবে। এই ছাত্ররাজনীতির কারণেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে আজ লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। কলেজটির ফলের সুনামটিও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নটর ডেম কলেজটি ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যই কি অনলাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে? দেশের শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-অভিভাবকসহ সচেতন নাগরিকরা নটর ডেম কলেজের নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্রভর্তির পক্ষে মতামত দিয়ে বলেছেন, অবশ্যই মিশনারি কলেজ নটর ডেমের ব্যাপারে সরকারকে উদারনীতি গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং ব্যবসা বা কোচিং সেন্টার বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়। আর কলেজগুলোতে প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, কোচিং ব্যবসা বন্ধ করার জন্যই অনলাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। মনিটরিং করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কলেজের ওপর আর কোনো ছাত্রভর্তির দায়িত্ব দেওয়া হবে না। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেসব কলেজ ৬০০ ছাত্রের বেশি ভর্তি করবে, সেসব কলেজকে অনলাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতির আওতায় আনা হবে। বাকি কলেজগুলো নিজের ইচ্ছামতো ছাত্রভর্তি করতে পারবে। একই দেশে দুই নীতিমালায় ছাত্রভর্তি পদ্ধতি বহাল রাখাও আইনসিদ্ধ নয়। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চালু করার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ দেখছি না। আর আজও কোচিং বাণিজ্য রমরমাভাবেই চলছে সারাদেশে। বিভিন্ন কোচিং সেন্টার কোন মন্ত্রণালয়ের অনুমতিতে কোচিং বাণিজ্য করে যাচ্ছে সেটাও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অজানা নয়। নটর ডেম কলেজ মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে সেই প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৪৯ সাল থেকে। এই কলেজ দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। গ্রামগঞ্জের দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের এই কলেজে পড়ার সুযোগ দিয়ে সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার দ্বার খুলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে দেশে দেশে ধনতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এতে ধনীর সন্তান উচ্চশিক্ষার সনদ কিনে নিচ্ছে অর্থের বিনিময়ে। গরিবের সন্তান উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু নটর ডেম কলেজ এই গরিবের সন্তানকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে আসছে। আর মিশনারিরা কলেজ পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছ থেকে টাকাও গ্রহণ করে না। তারা নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষাসেবা দিয়ে যুগ যুগ ধরে সোনার ছেলে গড়ে তুলছে। তাই নটর ডেম কলেজের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদারনীতি অবলম্বন করতে পারে। এই কলেজটি সরকারি সব নিয়মনীতি মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে কলেজের নিজস্ব অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে ছাত্রভর্তির দায়িত্বটা কলেজকেই দিতে হবে। তা না হলে কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শ ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
আমি নটর ডেম কলেজের ছাত্রভর্তি পদ্ধতির ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাদ সাধা সমস্যা নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছি। তিনি ছাত্রভর্তি প্রসঙ্গে বলেন, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মেধাবী সন্তানদের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নটর ডেম কলেজ এই ব্রত নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়ে ৬৫ বছর ধরে উন্নতমানের শিক্ষা দান করে আসছে। তিনি আরও বলেন, কলেজের নিজস্ব অনলাইনে ভর্তি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানাচ্ছি। অনলাইনে ছাত্ররা ফরম ফিলআপ করার সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, জোর করে সরকারি অনলাইনে ছাত্রভর্তি পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হলে নটর ডেম কলেজের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বিপন্ন হয়ে যাবে। 'বাংলাদেশে সুশিক্ষা বিস্তারে নটর ডেম কলেজের অবদান' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তা এই কলেজের ছাত্রভর্তি পদ্ধতির অধিকার বহাল রাখার দাবি জানান। সেই অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নটর ডেম শিক্ষা-ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সভাপতি ড. শাকির সবুর বলেন, যেহেতু নটর ডেম কলেজ সরকারের একটি টাকাও অনুদান হিসেবে নেয় না। নিজস্ব আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে দেশে শিক্ষাসেবা দিয়ে লাখ লাখ সোনার ছেলে গড়ে দিচ্ছে, সে কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কলেজের অনলাইনে ফরম ফিলআপ শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রভর্তির সুযোগ দিলে সরকার ও জাতির জন্য কোনো ক্ষতির কারণ দেখছি না। নটর ডেম শিক্ষা ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সহ-সভাপতি মাজেদুর রহমান তালুকদার বলেন, এবারও নিজস্ব পদ্ধতিতে ছাত্রভর্তি করার ব্যাপারে বাদ সাধলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে এবারও হাইকোর্টে যাওয়া হবে সুবিচার পাওয়ার জন্য। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, নটর ডেম কলেজের নিজস্ব ভর্তি-পদ্ধতি অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে আমরা বসে থাকতে পারি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভর্তি-বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইনে ভর্তি পদ্ধতিটাই বাজে পদ্ধতি। তিনি আরও বলেন, যে মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, সেই মন্ত্রণালয়ের অনলাইনে ছাত্রভর্তির বিষয়টি স্বচ্ছ হতেই পারে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা নটর ডেম কলেজে ছাত্রভর্তির জন্য তদবির করে ব্যর্থ হয়ে কলেজটির ওপর নাখোশ হয়। আর তখন থেকেই তারা নটর ডেম কলেজের ৬৫ বছরের ছাত্রভর্তির ঐতিহ্যকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ভর্তির মাধ্যমে কুক্ষিগত করতে চাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, সেটা নীতিমালা মাত্র, আইন নয়। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার ওপর নটর ডেম কলেজের নিজস্ব ছাত্রভর্তি পদ্ধতির স্থায়ী অনুমতি পাওয়া নির্ভর করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী অনুমতি না পেলে নটর ডেম কলেজকে অতীতের মতো উচ্চ আদালতে যেতে হবে। সেটা কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য শুভ খবর নয়। মিশনারিরা নটর ডেম কলেজ চালিয়ে শিক্ষাবাণিজ্য করে না। এই কলেজ বন্ধ করে দিলে তাদের কিছু যায় আসে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। কারণ একটি শ্রেষ্ঠ কলেজে আর দেশের সন্তানরা পড়তে পারবে না। এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
মহাসচিব, নটর ডেম শিক্ষা ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)