সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা ও গণতন্ত্র

ড. মো. গোলাম রহমান

৩১ মে ২০১৪

এটা সত্য, ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র 'হিকিস বেঙ্গল গেজেট' পরবর্তী দুই বছর ধরে যেসব আধেয় প্রচার করে গেছে, তার বিষয়বস্তু অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদসুলভ ছিল না; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। এই সংবাদপত্রের কল্যাণে উপমহাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো দেখল, সমাজের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রকাশ্য কথা বলার অধিকার রয়েছে। তার আগ পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর পালাবদল হতো রাজায় রাজায় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এবং সেই প্রক্রিয়ায় উলুখাগড়া জনসাধারণের ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। যেই শাসক হোক, তাকে মেনে নিতে হতো। জনগণের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করার কোনো উপায় ছিল না। খানিকটা ব্যক্তিগত বিদ্বেষমূলক হলেও সম্পাদক ও প্রকাশক জেমস অগাস্টাস হিকি তার পত্রিকায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড় কর্তাদের এমনকি লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের স্ত্রীরও কথিত অনিয়ম, স্ক্যান্ডাল সম্পর্কে লিখতে থাকেন এবং তা সমাজে বেশ নাড়া দেয়। ফলে কোম্পানির কর্তারা প্রথমে হিকিকে নানা হুমকি দেয় ও হয়রানিতে ফেলে। এক পর্যায়ে তাকে জেলে পুরে দেয় এবং হিকির গেজেট বন্ধ হয়ে যায়। স্বল্পমেয়াদি ওই পত্রিকা বন্ধ হলেও এর মধ্য দিয়ে পরে ইংরেজি ও দেশীয় নানা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের অবিনাশী অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে গেছে।
আজকের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের সংবাদপত্রগুলোর জন্য পূর্বসূরি হিকির গেজেটের প্রকাশকালের এই দ্বন্দ্বমুখর অবস্থা আজও বিদ্যমান। এর তিনটি দিক দেখতে পাই আমরা। প্রথমত, সংবাদপত্রের মাধ্যমে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার বা স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতাই শুধু যথেষ্ট নয়; দায়িত্বশীলতাও জরুরি। তৃতীয়ত, সংবাদপত্র বা আজকের রেডিও, টেলিভিশন, ওয়েবসাইটসহ সার্বিক সংবাদমাধ্যম হচ্ছে গণতান্ত্রিক চর্চার বাহন। বস্তুত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যেই নিহিত থাকে দায়িত্বশীলতা এবং জনসাধারণের মতপ্রকাশ করতে গিয়ে শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যে সংঘাত ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তা গণতান্ত্রিক চর্চার ধরন নির্ধারণ করে। বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশে সংবাদপত্র ঘিরে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চায় অবদান রাখার প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
আমার মনে পড়ছে, বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মাঝেমধ্যেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার তাগিদ দিয়ে থাকেন। কয়েক দিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইউনেস্কো-বাংলাদেশ এবং সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশনের একটি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে আমি সভাপতিত্ব করেছিলাম। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন_ সংবাদপত্র জঙ্গিবাদের মতো অগণতান্ত্রিক তৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না কেন? আমি তার এই কথার গুরুত্ব স্বীকার করি। সংবাদমাধ্যমের চূড়ান্ত স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। স্বাধীনতার চর্চার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতাও থাকতে হবে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে এই দায়িত্বশীলতা আরও জরুরি। কারণ এখানে প্রথাগতভাবে বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে না। আমরা দেখেছি, তারা নির্বাচিত হলেও সংসদে যায় না। সংসদে গেলেও জনগণের সমস্যা নিয়ে সোচ্চার থাকে না। নিজেদের রাজনৈতিক বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ফলে সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি জনগণের কথা নিয়ে সরকারের কাছে সংবাদমাধ্যমকেই যেতে হয়। কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমকেই বিরোধী দলের দায়িত্ব নিতে হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে অবস্থান নিতে হয় সংবাদমাধ্যমকেই। আমাদের মতো দেশে আসলে সংবাদমাধ্যমের সক্রিয়তাই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এখানে সংবাদমাধ্যম তাদের স্বাধীনতার প্রশ্নে যতটা সোচ্চার; দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে ততটা আগ্রহী নয়।
আমার বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যথেষ্ট রয়েছে। নব্বইতে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর দেশের বিপুল সংখ্যক সংবাদপত্র, বেসরকারি রেডিও-টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালু হয়েছে। সেগুলোতে সবাই স্বাধীনভাবে লিখতে পারছে, কথা বলতে পারছে। সত্তর বা আশির দশকে সংবাদমাধ্যমের ওপর যে সেন্সরশিপ ছিল, তা এখন নেই। ফলে অপরাধ, অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে কোনো বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমকে।
এ প্রসঙ্গে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে চাই। দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর প্রকাশিত দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান থাকে ওপরের দিকে। এই সূচক কিন্তু তৈরি হয় মূলত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে। তার মানে, দুর্নীতি নিয়ে যথেষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। পাশ্চাত্যের সংবাদপত্রে কিন্তু এত বেশি দুর্নীতি বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ হয় না। দুর্নীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের অভাবেও অনেক দেশ দুর্নীতির সূচকে নিচের দিকে থাকে। আবার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি থাকে, ১৪০-১৪৫-এর ঘরে। দুর্নীতি নিয়ে যদি এত সংবাদ প্রকাশ করা যায়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে আমরা পিছিয়ে থাকি কেন? আমি মনে করি, অনেক সময় দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার কারণে যে ঝুঁকি তৈরি হয়, তা-ই আমাদের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে পিছিয়ে রাখে।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোঝা যাবে। যেমন গত বছর ৫ মে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পুলিশি অভিযান নিয়ে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম অতিরঞ্জিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তারা বলেছিল, সেখানে শত শত মানুষ মারা গেছে। পরে দেখা গেছে, এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। কোনো কোনো পক্ষ যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, দেখা গেছে তারা বহাল তবিয়তে। এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যখন ব্যবস্থা নিতে গেছে সরকার, তখন সেটা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে আমরা পিছিয়ে গেছি। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমকে দেখা গেছে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে। অথচ এরা গণতন্ত্র ও সমাজবিরোধী। সরকার যখন এ ধরনের তৎপরতা বন্ধ করতে যায়, তখন সেটা সংবাদমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আমরা দেখেছি, একটি সংবাদপত্র কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তনের আলোকচিত্রকে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মিছিল বলে চালিয়ে দিয়েছিল! সংবাদপত্রের এ ধরনের স্বাধীনতা তো গণতন্ত্রের জন্য, সমাজের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
সম্প্রতি নরওয়ের অসলো থেকে আমার সঙ্গে এসব ব্যাপারে কথা বলা হচ্ছিল। আমি তাদের এ বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছি। কারণ পশ্চিমা বিশ্বের কিন্তু এমন পরিস্থিতির ব্যাপারে অভিজ্ঞতা নেই। সেখানকার সংবাদমাধ্যম সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ প্রশ্নে অনেক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাকে সবকিছুর ওপরে স্থান দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যায়, সেখানকার প্রশাসন জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে যেসব পদক্ষেপ নেয়, তা যার বিরুদ্ধেই যাক; সেটা তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে মেনে নেয়। কোনো সংবাদমাধ্যম যদি জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী অবস্থান নেয়, তাহলে সেই সংবাদমাধ্যম তারা বন্ধ করে দিতে দু'বার ভাববে না। সেটা সংবাদমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও পরিগণিত হবে না।
আমাদের মতো বিকাশমান গণতন্ত্র ও অর্থনীতির দেশে আসলে সাংবাদিকতা হওয়া উচিত উন্নয়নের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, স্থিতিশীলতার জন্য। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে অপপ্রচারমূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক সাংবাদিকতা করলে তাতে গণতান্ত্রিক চর্চাই ব্যাহত হবে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন দায়িত্বশীল নয়, তখন সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। তাহলেই দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় থাকবে। গণতন্ত্রবিরোধী জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ আশকারা পাবে না।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষ ভূমিকাও নিতে হবে। কেবল সরকার বা বিরোধী দলের সমালোচনা করলে, তা জনগণকে সঠিক চিত্র বুঝতে সহযোগিতা করে না। এ প্রসঙ্গে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে পরিচালিত জনমত জরিপগুলোর কথা বলা যায়। সেখানে দেখা গেছে, কেবল সরকারের কী কী ব্যর্থতা রয়েছে, সেদিকে আলোকপাত করা হয়েছিল। কিন্তু ছায়া সরকার বিবেচিত বিরোধী দল কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পেরেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে_ এসব ব্যাপারে প্রশ্ন ছিল না। এ ধরনের একপেশে প্রশ্নের ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপের ফলও একপেশে হতে বাধ্য। তখন জনসাধারণও সঠিক চিত্র পায় না এবং এতে জনমত স্বাধীনভাবে প্রতিফলিত হয় না। অস্বীকার করা যায় না_ সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা পছন্দ করে। পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়াতে হলে পাঠকের পছন্দ-অপছন্দের দিকে মনোযোগী থাকতে হয় বটে। কিন্তু এখানেই আসে দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন।
দৈনিক সমকালের দশম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে সংবাদমাধ্যমের কাছে আমি সেই দায়িত্বশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি অঙ্গীকারই প্রত্যাশা করি। সমকালের জন্যও শুভেচ্ছা। একটি নতুন সংবাদপত্রের জন্য প্রথম দশ বছর টিকে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখে থাকি অনেক নতুন সংবাদপত্র প্রকাশ হয়; কিন্তু দুই-এক বছরের মধ্যে তা প্রথম সারিতে উন্নীত ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সমকাল সেদিক থেকে সাফল্যের সঙ্গে টিকে রয়েছে, বিপুল পাঠকের আস্থা অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, নারীর ক্ষমতায়ন, নাগরিকের অধিকার প্রশ্নে ইতিবাচক অবস্থান নিয়ে আসছে এই সংবাদপত্র। আমি প্রত্যাশা করি, এই ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং সমকাল আরও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করবে।


অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)