চায়ের পেয়ালায় ঝড়

০৬ জুন ২০১৪

বিনায়ক সেন


এবারের বাজেট যে পরিবেশে দেওয়া হচ্ছে তা সম্ভবত বাজেটের আলোচনার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৫ জানুয়ারির নিরুত্তাপ নির্বাচন অলক্ষ্যে থেকে বাজেট নিয়ে তর্ক-বিতর্কের পরিবেশের ওপর এক ধরনের নিরুৎসাহের সৃষ্টি করেছে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে যে সরকার গঠিত হতো, সেই সরকারের প্রথম বাজেট ও বর্তমান বাজেটের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে কোথায় যেন একটা নৈতিক ফাঁক থেকে গেছে। এই রাজনৈতিক ছন্দপতনের প্রভাব বাজেট আলোচনার ওপরও পড়তে বাধ্য।



৬ শতাংশ থেকে উত্তরণ কি সম্ভব? :বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন তার নিজস্ব গতিশীলতা নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। বাজেটের আকার-প্রকার যা-ই হোক, তা এই গতিশীলতার ক্ষেত্রে খুব একটা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটাতে পারবে না। এ দেশের কৃষি খাতকে ধরে রেখেছে বাংলার কৃষক, রফতানি খাতকে ধরে রেখেছে তৈরি পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক আর রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ক্ষুদ্র ঋণ খাতের উত্তরোত্তর প্রসার গ্রাম ও শহরের নিচুতলার অর্থনীতিকে সেবা, পরিবহন ও ক্ষুদ্র বাণিজ্য খাতের মধ্য দিয়ে প্রবৃদ্ধিমুখী করে রেখেছে। এ অর্থনীতি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও পণ্ডিতরা চায়ের পেয়ালায় ঝড় তুলবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত পাঁচ বছরে এ অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৬.২ শতাংশ, না হয় কমিয়েই বলি_ মোটা দাগে ৬ শতাংশ। আরেকটা যমুনা সেতুর মতো পদ্মা সেতু না হলে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগ স্থাপিত না হলে, গভীর সমুদ্র বন্দর না হলে, ঢাকায় মেট্রোরেল না হলে, আন্তঃশহর রেলব্যবস্থা জোরদার না হলে, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবৃদ্ধির হারকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা যাবে না। সুশাসন নিয়ে যত কথাই বলি না কেন, ম্যাক্রো-কাঠামো নিয়ে যে সূক্ষ্ম বিচারই প্রয়োগ করি না কেন, রাজস্ব কাঠামোয় যত বৈপ্লবিক পরিবর্তনই আনি না কেন, কিছুতেই কিছু হবে না_ যদি ভৌত অবকাঠামোগত খাতে একটি বড় ধরনের 'ধাক্কা' না আসে। বাকি কাজটা জনগণ সুশাসনের অভাবের মধ্যেও করে নিতে পারবে। নিজেদের দারিদ্র্য কমাতে পারবে।





স্থানীয় সরকারের প্রসঙ্গ :এবারের বাজেটে স্থানীয় সরকারের ভূমিকাটি পুনরায় জোরেশোরে উপস্থাপিত হয়েছে। বর্তমানের কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য চাই নিচের দিকের স্থানীয় সরকারের ওপর অধিকতর ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ। কিন্তু বাজেটে এটা করার জন্য পূর্বশর্ত আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এর জন্য 'দক্ষ ও প্রশিক্ষিত আমলাতন্ত্রের' প্রয়োজন হবে। আমার মতে, 'বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রের' জন্য অপেক্ষা না করে এখনই ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া প্রয়োজন। অন্তত ১০ শতাংশ বাজেট-বরাদ্দ সরাসরি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের কাছে ন্যস্ত করা যেত। এতে করে স্থানীয় সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করে স্থানীয় পরিষদের পক্ষে স্থানীয় প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হতো, যা কেবল এডিপির মাধ্যমে সমাধান করা কঠিন। ভূমি মালিকানা সনদ এবং ভূমি জরিপ ও রেকর্ড সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শহর এলাকায় ভূমি, গৃহায়ন বা সম্পদের ওপর কোনো জরিপ করার তাগিদ দেখা যায়

না বাজেটের মধ্যে। গ্রামের তুলনায় শহরে জমি বা সম্পত্তির ওপরে মালিকানার বণ্টন আরও অসম। এটার সঙ্গে শহর এলাকায় সম্পত্তি কর বসানোর প্রশ্নটিও জড়িত। গ্রামের ক্ষেত্রে ভূমি মালিকানা সনদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিত্তহীন ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি বণ্টনের কথা উচ্চারিত হয়নি বা এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি কী করে আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে উন্নীত করা যাবে, সে নিয়ে কোনো দুর্ভাবনা নেই।





সম্পদ আহরণ তথা অর্থায়নের প্রশ্ন :বাজেটে যথার্থভাবেই স্থানীয়ভাবে সম্পদ আহরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ কর, বিশেষত আয়করের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিত্তশালীরা বেশি হারে আয়করের ওপর 'সারচার্জ' দেবেন, এটাও ঠিক আছে সুষম উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু এ দেশে এখনও 'সম্পদ কর' (ওয়েলথ ট্যাক্স) নেই। যেমনটা আছে পাশের দেশ ভারতে বা পাশ্চাত্যের উন্নত দেশে। এটা বাস্তবায়িক হলে অনায়াসে ১০০০-২০০০ কোটি টাকা আহরণ করা যেত। আয়করের সারচার্জের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মূল্যায়নে 'ফেয়ার মার্কেট ভ্যালু' প্রয়োগ করা উচিত ছিল। তবে শুধু স্থানীয় উদ্যোগে সম্পদ সমাবেশ করাই যথেষ্ট নয়। আমরা এখনও স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়েছি। আরও কিছুদিন সেই তালিকায় থাকব। সে ক্ষেত্রে কম সুদে বৈদেশিক সাহায্য জোরদারভাবে সংগ্রহের প্রতি আমাদের আরও সচেষ্ট হওয়া উচিত।





মধ্যবিত্তের অর্থনীতিতে উত্তরণ চাই :সবশেষে, মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে একটা কথা বলতে চাই। আমরা শুধু মধ্য আয়ের দেশ নয়, মধ্যবিত্তের দেশে পরিণত হতে চাই। কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করে এটা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী; দরকার উন্নত মানের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থা। সংস্কৃতি খাতে যত ব্যয় হয়েছে, তার সিকিভাগও ব্যয় হয় না এ দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে। 'আইসিটি' আর বিজ্ঞান গবেষণা এক জিনিস নয়। শিক্ষা খাতে তাই ব্যয় বরাদ্দ আরও বেশি হারে বাড়ানো প্রয়োজন। ভারতে যেমন বিশ্বখ্যাত উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান (যথা_ আইআইটি এবং আইআইএম) রয়েছে, সে রকম প্রতিষ্ঠান সামান্য সরকারি সহায়তা পেলে আমাদের দেশেও গড়ে উঠতে পারে। বস্তুত পিপিপির জন্য উঁচু মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা একটি জরুরি বিবেচনা হতে পারে। এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলে আগামী ১০ বছরে আমাদের উচ্চশিক্ষার মান শুধু নয়, আমাদের আমলাতন্ত্রের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের চিত্রটাই আমূল বদলে যাবে। একটি মধ্যবিত্ত অর্থনীতি নির্মাণের জন্য এটি অবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। এ ব্যাপারে এ বাজেটের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আশা করেছিলাম।



 


© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)