সমকালীন প্রসঙ্গ

দ্বিতীয় রেনেসাঁর আগমনী আভাস

ফ. র. আল সিদ্দিক

১০ জুন ২০১৪

ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সাবেক পরিচালক

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গদেশে রামমোহন রায়, ভিভিয়ান ডিরোজিও প্রমুখ মনীষীর অনুপ্রেরণায় বাঙালি জাতির জীবনে যে রেনেসাঁর উদ্ভব হয়ে পরবর্তীকালে রবীন্দ্র-নজরুল, মেঘনাথ সাহা, সত্যেন বোসের প্রতিভার ছোঁয়ায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছিল, বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে এসে ধর্মীয় গোঁড়ামির পাল্লায় পড়ে কলঙ্কজনক সাম্প্রদায়িক হিংসা, বিদ্বেষ ও হানাহানিতে সেই রেনেসাঁটা হারিয়ে যায়।
রামমোহন রায় কর্তৃক আত্মীয়সভা এবং হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের মতো যেসব মানবতাবাদী প্রগতিশীল আলোচনা সভা-সমিতি গড়ে ওঠে, সে যুগে বাঙালি রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ এবং চলি্লশের দশক থেকে উক্ত শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত এসব সভা-সমিতি বা যুক্তির আলোকে আলোকিত আড্ডাস্থলগুলোর সংখ্যা খুবই কমে যাওয়ায় রেনেসাঁকে হারিয়ে আমরা এক অন্ধকার যুগে পতিত হয়েছিলাম।
সে যুগে এই উপমহাদেশে প্রগতিশীলতার আলোকে সুদীপ্ত আলোচনা সভাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বাঙালিদের মনে যে হতাশা ও মনোবেদনার সৃষ্টি হয়েছে, তার একটা বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে_ 'কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই' নামক গানটির সৃষ্টি এবং গীত হওয়ার পরপরই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি ভীষণভাবে জনপ্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে।
সেই অন্ধকার যুগেও তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক যেসব সভা-সমিতি টিমটিমে মাটির প্রদীপের মতো, সে যুগের অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মুক্তচিন্তা ও মানবতার দৃপ্ত জয় গান গাইবার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তাদের দু'চারটির সঙ্গে আমার উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণের অভ্যাস গড়ে উঠেছিল এবং এসব আলোচনা থেকে আমি বুঝতে পারতাম যে, আমাদের দেশের সেই অমানিশা যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক না কেন, ভোরের সূর্য অদূর ভবিষ্যতে একদিন উদিত হবেই।
বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শেষ প্রান্তে এসে আমাদের মনে হতে থাকে যে, একবিংশ শতাব্দী হয়তো আমাদের জন্য একটা নতুন কিছু নিয়ে আসবে এবং সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গে এ দেশে নতুন নতুন আলোচনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। এসব যুক্তিবাদী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে এখন আবার নতুন করে যুক্তির জগৎ প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে। ফলে আমরা আমাদের জাতীয় জীবনে দ্বিতীয় রেনেসাঁর (বৈষ্ণব পদাবলির যুগটাকে প্রথম রেনেসাঁ ধরলে আজকের এই রেনেসাঁটি হবে তৃতীয় রেনেসাঁ) দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছি।
বর্তমান সাম্প্রদায়িক হানাহানির অন্ধকার যুগ থেকে আমাদের আবার অলোকোজ্জ্বল রেনেসাঁর যুগের দ্বারপ্রান্তে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য এ যুগে নতুন করে গড়ে ওঠা পাঠাগারগুলোরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনের শেষার্ধে আমরা নিজেদের মধ্যে যার কাছে যে কয়টা গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই-পুস্তক ছিল, সেগুলোকে একত্র করেই এ দেশের পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামগঞ্জে বেশ কিছু পাঠাগার গড়ে তুলেছিলাম। এসব পাঠাগারের উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন বলে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাদের বেশিরভাগই দেশ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যাওয়ায় এসব পাঠাগার বিলুপ্ত হয়ে যায়। তার ফলে জ্ঞান চর্চার পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার ফলে আমাদের ওপর আগত অন্ধকার যুগে যুগে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
সেই যুগে এ দেশের পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর বেশিরভাগই সরকারি অবহেলায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। এখনও দুঃখের বিষয় এই যে, সে যুগে সেসব পাবলিক লাইব্রেরি স্থবির হয়ে পড়েছিল, তা বেশিরভাগই আজ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। পাঠকদের জন্য সেগুলোর দরজা খোলা হয় না।
এসব কারণে জ্ঞানচর্চা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ায় রেনেসাঁর মৃত্যু ঘটে। পরবর্তীকালে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে। সে সঙ্গে সারাদেশের এখানে-সেখানে ব্যক্তিগত অথবা সমষ্টিগত প্রচেষ্টায় একটি-দুটি করে পাঠাগার গড়ে উঠতে শুরু করে। এভাবে এ দেশে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে এ ধরনের পাঠাগার গড়ে তোলার উৎসাহ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এখন তো সারা বাংলাদেশে প্রায় দেড় সহস্রাধিক বেসরকারি পাঠাগার গড়ে উঠেছে। ঢাকার মিরপুরেই এখন ১৪টি বেসরকারি পাঠাগার রয়েছে। এসব যুক্তিবাদী আলোচনা সভা এবং গণগ্রন্থাগারগুলোর আলোকিত প্রভাবেই আমাদের মানসজগৎ মানবতাধর্মী, যুক্তিবাদী সংস্কৃতিমনা এবং সৃজনশীলরূপে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। তার ফলেই ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে বাঙালির জাতীয় জীবনে একবিংশ শতাব্দীর এই নতুন রেনেসাঁ।
আজকের এই নতুন রেনেসাঁর আগমনী লগ্নে এ দেশের উদার মনোভাবাপন্ন, যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল মানুষদের ওপর, ধর্মান্ধ মানুষরা সে রকম বৈরী আচরণ করছে, তেমনি রামমোহন-ডিরোজিও প্রতিষ্ঠিত রেনেসাঁর প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রগতিবিরোধী দুষ্টচক্র, সে যুগের আলোকে আলোকিত মানব প্রতিভাদের নানাভাবে নিগৃহীত করত। সে যুগের ধর্মান্ধরা যুক্তিবাদী মানুষদের কীভাবে নিগৃহীত করত, তা বোঝার জন্য এখানে শুধু দুটি উদাহরণ দিচ্ছি।
১. একেশ্বরবাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার জন্য রাজা রামমোহন রায়কে তার পিতা এবং তাদের সমাজ তাকে তার পিতৃগৃহ থেকে বহিষ্কৃত করেছিলেন; ২. ডিরোজিও বাঙালি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জিজ্ঞাসার প্রতি আগ্রহান্বিত করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাকে হিন্দু কলেজের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
এ যুগে যুক্তিবাদের প্রতি আগ্রহান্বিত মানুষদের ধর্মান্ধরা নাস্তিক ইত্যাদি অপবাদ দিয়ে তাদের ওপর নানা রকম অত্যাচার করতে এবং ধমকা-ধমকি দিয়ে চলেছে। বিগত রেনেসাঁর মতো এবারের রেনেসাঁটিও যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য চিন্তাভাবনা এবং প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করার জন্য এ দেশের সুধী মহলের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিগত রেনেসাঁটি কীভাবে অর্জিত হয়েছিল তা জানতে যে পুস্তকগুলো সে যুগের চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছিল, সেগুলোর মধ্যে তিনটি পুস্তক আমি অনেক দিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। সেগুলোর মধ্যে বর্তমানে আমি থমাস পেইনের 'এইজ অব রিজন' নামক পুস্তকটি খুঁজে পেয়ে সেটাকে অনুবাদ করতে শুরু করেছি। বাকি দুটি বই রাজা রামমোহন রায়ের_ ১. ঞযব ঢ়ৎবপবঢ়ঃং ড়ভ ঔবংঁং (১৮২০) এবং ২. ফারসি ভাষায় রচিত তুহফাতুল মুযাহিদদীন নামক বইটা এখন খুঁজে পাচ্ছি না।
এই প্রবন্ধটির পাঠকদের মধ্যে কারও কাছে যদি এই পুস্তক দুটি অথবা এ দুটি যদি অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করা হয়ে থাকে, সেই অনুবাদ গ্রন্থের খোঁজ থাকে, তাহলে তিনি আমাকে সেই গ্রন্থের ফটোকপি সংগ্রহ করার সুযোগ করে দিলে বাধিত হবো।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)