যুদ্ধ ও ভালোবাসার গল্প

১২ মার্চ ১৫ । ০০:০০

সোহেল আরমান

দীর্ঘ ৫ বছর পর অবশেষে 'এইতো প্রেম' ছবিটি ১৩ মার্চ সারা দেশের প্রায় ১০০টি হলে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার হৃদয়ের জমানো পাঁচ বছরের দুঃখ-ক্লান্তি-অবসাদ আর বন্দি স্বপ্নগুলো একঝাঁক সাদা কবুতর হয়ে ডানা মেলেছে সুনীল আকাশে। 'এইতো প্রেম' ছবিটির আর কোনো কালো মেঘ নেই আর কোনো প্রতীক্ষার প্রহর নেই। সে এখন তৈরি দর্শকদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর।
দীর্ঘ প্রায় বছর কুড়ি হবে আমি টিভি মিডিয়ায় অসংখ্য নাটক লিখেছি ও পরিচালনা করেছি। আর অভিনয় তো করেছিই, মূলত সোহেল আরমান নামটি দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ১৯৯৪ সাল থেকেই। আমার টেলিভিশন মিডিয়ার কাজগুলো অনেক জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। কিন্তু তার পরও আমার মন ভরছিল না, কেন জানি অতৃপ্ত থাকতাম। কেন অতৃপ্ত আমি? পরে বুঝলাম চলচ্চিত্রই আমার মূল ঠিকানা। আমি চলচ্চিত্র পরিচালক হতে চাই। কিন্তু কী করে হব? আমার বাবা স্বনামধন্য চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের মতো কি চলচ্চিত্র আদৌ নির্মাণ করতে পারব? নাহ মন সায় দেয় না। বারবারই মনে হয় বাবা তো অনেক বড়মাপের, তার সঙ্গে শুধু তুলনা কেন, প্রশ্নই ওঠে না। তার পরও কিছুতেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করার অদম্য স্পৃহাকে আটকাতে পারছিলাম না। কোত্থেকে আসে এত আবেগ, আমি কি চলচ্চিত্রের ভাষা তৈরি করতে পারব ৩৫ মিমি. ক্যামেরা দিয়ে? চোখের সামনে ভেসে উঠল জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, আলমগীর কবির, চাষী নজরুল ইসলাম, সুভাস দত্ত, আমজাদ হোসেন_ এমন আরও অনেক বরেণ্য চলচ্চিত্রকারদের ছবিগুলো। কী অসাধারণ সব ছবি? বদলে যেতে পারে কাল-ক্ষণ-সময়, কিন্তু তাদের সৃষ্টিগুলো যেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে। ১৯৭১-এর পর তারাই যেন জন্ম দিয়েছেন এ দেশের চলচ্চিত্রকে। তাদের প্রতিটি ছবিতেই বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যেত। খুঁজে পাওয়া যেত এ দেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি আর সভ্যতাকে। হ্যাঁ, তখনই মনে হলো তারা পারলে আমি পারব না কেন? আমরা পারব না কেন? যতই আসুক অপসংস্কৃতি, আকাশ সংস্কৃতি,


এ দেশের মানুষ ভুল করে না কখনোই। এ দেশের কথা বলতে পারলে, এ দেশের জীবনের কথা বলতে পারলে আমার চলচ্চিত্রের ভাষা বৃথা হবে না, দর্শক হয়তো সমাদরে গ্রহণ করবেন। এমনি এক আবেগ নিয়ে আমার চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে। প্রথমেই আমার প্রযোজক শাহীন কবিরকে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ তিনি সম্মত হয়েছিলেন আমার এ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের গল্পটিকে চলচ্চিত্রে রূপদান করার জন্য। ব্যস, শুরু হয়ে গেল আমার কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ আর গীত রচনার কাজ। অনেক সময় নিয়ে করলাম। পুরো ২০০৯ সাল লেগে গেল এ কাজগুলো শেষ করতে। হাবিব ওয়াহিদকে নিয়ে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে 'এইতো প্রেম'-এর পাঁচটি গান শেষ করলাম। শুরু হলো ২০১০ থেকে শুটিংয়ের কাজ। কত অজস্র বাধা আর সমস্যা পেরিয়ে ২০১৩ সালে শেষ হলো শুটিংয়ের কাজ। তারপর ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কারিগরি কাজ, শেষমেষ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলো 'এইতো প্রেম'-এর সব কাজ। অবশেষে সেন্সর ছাড়পত্র এবং ১৩ মার্চ, ২০১৫ শুভমুক্তি।
হয়তো এখনই বলবেন এত কেন দেরি হলো? হ্যাঁ হলো, কারণ একটাই_ আপস করে 'এইতো প্রেম' নির্মাণ করতে চাইনি। তাই অনেক অনেক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তার কয়েকটি প্রধান সমস্যার কথা বলি। প্রথমত 'এইতো প্রেম'-এর কাহিনীটি বিশেষ করে শীতকালকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সে কারণে বর্ষায় শুটিং করতে পারিনি। এক শীত মৌসুমে কাজ শেষ না করতে পেরে আমাকে পরবর্তী বছরের শীত মৌসুমকে বেছে নিতে হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, শাকিব খানকে নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং করাটাও ছিল ভীষণ অসম্ভব ব্যাপার। এত হাজার হাজার মানুষ শাকিবের ভক্ত যে, শুটিং করাটাই দুষ্কর হয়ে উঠত। সে কারণে অনেক সময়ই শাকিবের কাজগুলো অসমাপ্ত রয়ে যেত, যা পরবর্তী সময়ে কন্টিনিউটি মেলানোর জন্য আবার নতুন সিডিউলে আগের অসমাপ্ত কাজের জায়গায় ফিরে যেতে হতো এবং বহু কষ্টে হাজার মানুষের ভিড়ে আমাদের কাজ শেষ করতে হতো। তৃতীয়ত, ৩৫ শুটিং করার পর পরবর্তীতে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরের একটা বিশাল ঝামেলায় আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। এই তিনটি কারণ ছাড়াও আরও অনেক সমস্যা ছিল। আল্লাহর রহমতে আমরা সব সমস্যাই উৎরে গেছি।
ধন্যবাদ জানাই আমার সব কলা-কুশলীকে, যারা অত্যন্ত ধৈর্য আর আন্তরিকতার সঙ্গে আমার ছবিতে কাজ করেছেন এবং ছবিটি শেষ করতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে শাকিব খান, বিন্দু, হাসান ইমাম, রামেন্দু মজুমদার, লায়লা হাসান, আফরোজা বানু, অমিত হাসান, খুরশিদুজ্জামান উৎপল, শহীদুজ্জামান সেলিম, মাসুম আজিজ, নিপুণ প্রমুখ।
শেষকথা
৩০ লাখ শহীদ হলে ৩০ লাখ গল্প আছে, হয়তো কোনো মুক্তিযোদ্ধার গল্প লুকিয়ে আছে আমাদের 'এইতো প্রেম' ছবিটিতে। চেষ্টা করেছি চলচ্চিত্রের ভাষায় একটি ছবি নির্মাণ করতে। সফল হবো কি-না জানি না। তবে একটা ভীষণ সৎ চেষ্টা ছিল। মানুষ প্রকৃতগতভাবেই ভালোবাসা বোঝে, হৃদয়ের মাঝে প্রেমের জন্ম নেয়। প্রেম ছাড়া তো কোনো মানুষই নেই, প্রেমের রকমফের থাকতে পারে। প্রেম আছে বলেই প্রিয়জন হয়, আর প্রিয়জন হারানোর শোকেই মানুষ যুদ্ধে যায়। ছোট ছোট স্বার্থ যেন একটা বৃহত্তর স্বার্থে রূপ নেয় আর সেটা হলো দেশপ্রেম। 'এইতো প্রেম' মূলত একটি প্রেম কাহিনী, যা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া কোনো গল্প। দর্শকরা হয়তো একটি প্রেম কাহিনী দেখতে গিয়ে দেশ জয়ের গল্প দেখে আসবেন। আশা করি, ভালো লাগবে সবার। অনেক কথাই বলার ছিল, শেষ করতে পারলাম না। হয়তো আমার প্রথম চলচ্চিত্র 'এইতো প্রেম' সব কথাই বলবে।
নিরলসভাবে বাবা আর মা আমাকে এই দীর্ঘ ৫ বছর সার্বক্ষণিক উৎসাহ দিয়ে গেছেন। সত্যি শুধু তোমার সন্তান হিসেবেই নয়, একজন চলচ্চিত্রকার হয়েও ঋণি হয়ে থাকলাম আজীবন।
একনজরে
১. ছবির নাম :এইতো প্রেম
২. কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীত রচনা ও পরিচালনা :সোহেল আরমান
৩. প্রযোজক :শাহীন কবির
৪. চিত্রগ্রহণ :এআর স্বপন
৫. সঙ্গীত :হাবিব ওয়াহিদ
৬. সম্পাদনা : মুমিয়া রহমান দুলু
৭. আবহ সঙ্গীত :বিপ্লব বড়ূয়া
৮. কোরিওগ্রাফি :সোহেল আরমান ও মাসুম বাবুল
৯. ফাইট :আরমান
১০. কারিগরি সহযোগিতা :রেইন পিকচার্স ও ইঋউঈ
১১. কণ্ঠশিল্পী :হাবিব/ন্যান্সি/মিলন মাহমুদ/আরেফিন রুমী/প্রদীপ কুমার ও ডলি সায়ন্তনী।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com