বেহাত হয়ে যাচ্ছে ওয়াক্ফ সম্পত্তি

আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় কয়েক হাজার মামলা - ভূমি অফিসের চেয়েও ওয়াক্ফ অফিসে দুর্নীতি বেশি

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ১৫ । ০০:৫৭

ওয়াকিল আহমেদ হিরন


বেহাত হয়ে যাচ্ছে ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তি। পূর্বপুরুষরা তাদের সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে গেলেও জমির রেকর্ড পরিবর্তন করে নিজেদের দখলে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের উত্তরসূরিরা। এ ব্যাপারে সহযোগিতা করছেন একশ্রেণীর 'মোতোয়ালি'।

মোতোয়ালিরা ওয়াক্ফ সম্পত্তি দেখভাল করেন। ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়োগদাতা। ১৯৬২ সালের ওয়াক্ফ অধ্যাদেশের ২ ধারায় বলা হয়েছে, 'কোনো মুসলমানের ধর্মীয়, পবিত্র বা দাতব্য কাজের উদ্দেশ্যে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করাকে ওয়াক্ফ বোঝায়। তবে কোনো অমুসলিম ব্যক্তিও ওয়াক্ফের উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি দিতে পারবেন।' ওয়াক্ফ প্রশাসক কার্যালয়ের এক জরিপমতে, সারাদেশে বেহাত হয়ে গেছে কমপক্ষে ৩৭ হাজার ৭৯৪ একর ওয়াক্ফ সম্পত্তি। এসব সম্পত্তি উদ্ধারে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা চলছে ধীরগতিতে। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত কয়েক হাজার মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। সরকারি সহযোগিতায় মোতোয়ালি ও পরিদর্শকের মাধ্যমে এসব সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ওয়াক্ফ প্রশাসক ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া।





জানা গেছে, রাজধানীর সূত্রাপুরের রোকনপুর ও কাজীরবাগ এলাকায় কাজী আবদুর রউফ ওয়াক্ফ এস্টেটের ১৮ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে ১০ বিঘা বেদখল হয়ে গেছে। ওয়ারিশরা স্থানীয় ভূমি অফিসের সহায়তায়

রেকর্ড সংশোধন করে নিজ দখলে রেখেছেন। রেকর্ড সংশোধন, নামজারি ও দেওয়ানিসহ মোট ১৫টি মামলা করা হয়েছে। চকবাজার হোসেনী দালান রোডে সুলতান নেছা খানম ওয়াক্ফ এস্টেট ওয়ারিশরা দখল করে নিয়েছেন। ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে উচ্ছেদের জন্য ঢাকার জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।





মিরপুর দুয়ারীপাড়ায় ফয়জুন্নেসা ওয়াক্ফ এস্টেটের মধ্যে পাঁচ একর সম্পত্তি এরশাদ সরকারের শাসনামলে হাউজিং এস্টেটের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষ দুর্বল থাকায় ১৯৯৪-৯৫ সালে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি জমি রক্ষা কমিটি করে ওই এস্টেটের দায়িত্বে থাকা মোতোয়ালিকে সমর্থন দেয়। এরপর তারা মোতোয়ালির সঙ্গে যোগসাজশে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে। প্লট ক্রেতারা স্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে আবাসন নির্মাণ করে ওয়াক্ফর প্রজা হিসেবে সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন। এ নিয়ে হাউজিং এস্টেটের সঙ্গে ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষের ১৭-১৮টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। নওগাঁ জেলার পত্নীতলায় ছমিরউদ্দিন ওয়াক্ফ এস্টেটের রয়েছে ১ হাজার ২০০ বিঘা সম্পত্তি। ছমিরউদ্দিন চৌধুরী ১৯০১ সালে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে ওয়াক্ফ (লিল্লাহ) করেন। আরএস রেকর্ড খুঁজে ১৯৯৭-৯৮ সালে ১০১ দশমিক ১৭ একর সম্পত্তি পাওয়া যায়। এর মধ্যে অধিকাংশ সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। কিছু সম্পত্তি বেহাত হয়েছে ওয়ারিশদের নামে রেকর্ড হওয়ার কারণে। এস্টেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র ২৮ একর সম্পত্তি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার এলাহী বক্স মণ্ডল ওয়াক্ফ এস্টেটের মোট জমির পরিমাণ ৪৪০ দশমিক ৮৫ একর। যার মধ্যে বর্তমানে ওয়াক্ফ এস্টেটের দখলে আছে ২৯৩ দশমিক ৯১ একর। বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশরা নিজেদের নামে রেকর্ড করে নেওয়ায় তা বেহাত হয়ে আছে। একই জেলার সদর উপজেলায় তালিকাভুক্ত ইশারতুল্লাহ ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তির পরিমাণ ৫ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৩৪ একর। যার মধ্যে এস্টেটের দখলে আছে মাত্র ৮৭৫ দশমিক ৭ একর। বাকি সম্পত্তি প্রজাবিলি। ২০১৩ সালে ৫৮ দশমিক ৯৮ একর সম্পত্তি হিসাবে পাওয়া গেছে। বাকি ৮১৬ দশমিক ৯ একর সম্পত্তির কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষ মনে করছে ওয়ারিশরা ওই সম্পত্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন।





রাজধানীর সায়েদাবাদ, নারিন্দা, লালবাগ, উত্তরা, মিরপুর এলাকায় একাধিক ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। দেশের ওয়াক্ফ এস্টেটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেট। ৭২ হাজার একর সম্পত্তির মালিক এ এস্টেট। এরপর আইনুদ্দিন হায়দার ও ফয়েজুন্নেসা ওয়াক্ফ এস্টেট। এই এস্টেটের সম্পত্তির পরিমাণ সাড়ে ১২ হাজার একর। আইনুদ্দিন হায়দারের সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে বঙ্গভবন ও সচিবালয়। ঢাকায় বেদখল হয়ে আছে প্রায় ২০০ একর সম্পত্তি।

সারাদেশে ওয়াক্ফ এস্টেটের সংখ্যা ১ লাখ ৩৯ হাজার ২৫৬টি, সব মিলিয়ে যার সম্পত্তির পরিমাণ ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫০ একর। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫০০ তালিকাভুক্ত ওয়াক্ফ এস্টেট রয়েছে। অতালিকাভুক্তের সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৪টি। এসব ওয়াক্ফর মধ্যে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, মাজার, ঈদগাহ, কবরস্থান, দীঘি-পুকুর ইত্যাদি। ওয়াক্ফ রাষ্ট্রের একটি সেবামূলক ও কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়াক্ফ প্রশাসক কার্যালয় পরিচালিত হয় আসছে।





জানা গেছে, ভূমি অফিসের চেয়েও ওয়াক্ফ অফিসে দুর্নীতি অনেক বেশি হয়। তবে দুর্নীতি প্রমাণ করা কঠিন। অভিযোগ রয়েছে, ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে উৎকোচ ছাড়া কাজ করা দুরূহ। মোতোয়ালি নিয়োগ এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। তবে ওয়াক্ফ প্রশাসক ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়ার দাবি, গত বছর ১৬ এপ্রিল তিনি যোগদানের পর দুর্নীতি অনেক কমেছে।

যেভাবে দুর্নীতি :প্রতিটি ওয়াক্ফ এস্টেট দেখভাল করার জন্য একজন করে মোতোয়ালি রয়েছেন। সারাদেশে মোতোয়ালির সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। অভিযোগ আছে, বছরে একটা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানা) থেকে যা আয় হয়, তার এক-তৃতীয়াংশ ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষকে দেখানো হয়। বাকি আয় কিছু কিছু মোতোয়ালি ও তাদের নিজস্ব লোকদের পকেটে চলে যায়। অনেক মোতোয়ালি ওয়াক্ফ সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে নিজ বা আত্মীয়দের নামে দলিল করে নেন। এরপর চলে বছরের পর বছর মামলা।





সারাদেশে ওয়াক্ফ সম্পত্তি দেখভালের জন্য মাত্র ৩৮ জন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) রয়েছেন। অভিযোগ আছে, পরিদর্শক ও মোতোয়ালি মিলে ওয়াক্ফ সম্পত্তি গ্রাস করছেন। আবার পরিদর্শকরা মোতোয়ালি নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। সরকার ওয়াক্ফকে কোনো অর্থ দেয় না। আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৩-১৪ সালের বার্ষিক আয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৬ হাজার ২৯ টাকা। মোতোয়ালিরা আদায় করেছেন ৫ কোটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ১৩ টাকা।

জনবলের অভাব :ওয়াক্ফ প্রশাসনের ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫০ একর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছে ৯ জন কর্মকর্তাসহ ১০০ জনবল। বাকিরা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। জনবলের অভাবে ভালোভাবে কাজ করতে পারছে না ওয়াক্ফ প্রশাসন। ৬৪টি জেলার জন্য ৩৮ জন পরিদর্শক নিজ নিজ আঞ্চলিক কার্যালয়ে বসে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রধান কার্যালয় থেকে ৯৫৬ জনবল চেয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।





দুর্নীতির দৃষ্টান্ত :রাজধানীর উত্তরায় আমিনউদ্দিন আহমেদ ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতোয়ালি হাজী মো. নাসিরউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গত বছর একটি লিখিত অভিযোগ ধর্ম মন্ত্রণালয়, রাজউক ও ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে দাখিল করা হয়েছে। এলাকাবাসীর পক্ষে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনেও চিঠি দেওয়া হয়। আমিনউদ্দিন আহমেদ ওয়াক্ফ এস্টেটের অধীনে রয়েছে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে আজমপুর জামে মসজিদ এবং ৬ নম্বর সেক্টরে আজমপুর ফোরকানিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা। হাজী নাসিরউদ্দিন প্রতিষ্ঠান দুটির মোতোয়ালি ও সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাজী মো. নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে গত ৭ মে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াক্ফ প্রশাসক ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া সমকালকে জানান, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে এই মর্মে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, আজমপুর দারুল উলুম মাদ্রাসা কমিটিকে উপেক্ষা করে রাজউক ও ওয়াক্ফ এস্টেটের অনুমোদন না নিয়ে পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া মাদ্রাসার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রাজউকের অনুমতি ছাড়া চারটি দোকান ঘর নির্মাণ করে মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মাদ্রাসার আয় খাতে জমা দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭-৮ লাখ টাকা। তবে নাসিরউদ্দিন সরকার তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, পারিবারিক শত্রুতার কারণে তার বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ আনা হয়েছে।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com