ক্যানভাসে নতুন ঠিকানা

১৯ মে ২০১৭

তানভির নাহিদ

কাকতালীয়ভাবে বাড়িটির নম্বর ৬/৬, যা দৃষ্টিশক্তির পূর্ণ সামর্থ্যকে প্রকাশ করে। ৬/৬ এই সংখ্যায় গ্যালারিটির নামও 'স্টুডিও ৬/৬', ঠিকানা আজিজ মহল্লা, জয়েন্ট কোয়ার্টার, ব্লক এফ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭।
গত ৬ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এ গ্যালারিতে ফারহানা আফরোজ ও নাজিব তারেকের যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী হয়ে গেল। যৌথতা তাদের দুই দশকেরও বেশি সময়ের; সাংসারিকতা ও দাম্পত্যের। তবে যতদূর সম্ভব দু'জনের যৌথ প্রদর্শনী এবারই প্রথম।
ফারহানা আফরোজ বা নাজিব তারেক দু'জনই এবার আঁকেননি। আঁকেননি এই অর্থে যে, তারা বরাবরই 'অবয়বি' বা ফিগারেটিভ চিত্র রচনার প্রয়াসী। এবারই প্রথম তাদের ফ্রেম থেকে অবয়ব উধাও হয়েছে। হতে পারে, অভিজ্ঞতার সে রকম কোনো পর্যায়ে তারা পেঁৗছেছেন। এর মধ্য দিয়ে উপস্থাপনার প্রশ্নে বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে অভিনব, বিশিষ্ট বা স্বতন্ত্র কিছু কি যুক্ত হলো? নাজিব তারেকের রেখায় যে নিজস্বতা, কল্পনার বিস্ময়, নির্মাণের সাবলীলতা ও উপস্থাপনার দৃঢ়তা দেখা যেত; এবারের নতুন ধারায় কি সেই নিজস্বতা আছে?
ফারহানার রেখার যে সরলতা, কল্পনার নিমগ্নতা ও উপস্থাপনার সি্নগ্ধতা দেখা যেত; রেখাহীন চিত্রপটে তা কীভাবে তিনি অতিক্রম করলেন?
প্রদর্শনীর প্রকাশনাটিতে ফারহানা লিখেছেন, 'বিশ বছর কোনো ছবি আঁকা হয়নি বললেই চলে। এই দুই দশকে আমি থেকে হয়ে গেছি আমরা। কর্মজীবনের প্রথম কিছুদিন শিক্ষকতা, তারপর শুরু হয় পোশাক ব্যবসা 'বাঙ্গাল'। সব ছেড়ে পুনরায় আঁকাআঁকিতে ফেরা বছর দুয়েক হবে। ইতিমধ্যে নিজের মধ্যে চলে এসেছে পরিবর্তন শুধু বিষয় বা কাজের ধরনে নয়; তার পেছনের ভাবনাতেও। দুই দশকের কর্ম ও জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার নিরিখে পরিবার ও দৈনন্দিন জীবনের পৌনঃপুনিকতা এবং নিজেকে হারিয়ে খোঁজাই ক্যানভাসে প্রতিচ্ছায়া হয়ে আছে যেন। নিজেকে ফিরে পেতে বাংলাদেশের চিত্রকলার অবয়বহীনতার স্রোতে যোগ দিলেন কি ফারহানা?
বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসের অবয়বি চর্চা থেকে অবয়বহীনতায় প্রয়াস ও প্রবণতার এ পর্যায়টি শিল্পীদের ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাতে একটি সমবিন্দু চিহ্নিতকরণ বাকি থেকে গেছে।
হারানো নিজেকে খোঁজা। নিজে আমি কী? এখন পর্যন্ত যা আমি, আমার অতীত, এখন পর্যন্ত আমার মধ্যে তা কীভাবে আছে। আমার চেতনায় স্মৃতিতে আছে। স্মৃতি তো টুকরো টুকরো কাছের ও দূরের, আলো আর ছায়ার। কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ছাড়াই কোনো স্মৃতির ভার কেন নিতে যাব আমি? শিল্পীর জন্য এ রকম একটি পর্যায়, সে যে কারণেই আসুক না কেন, তা একটি বিশেষ ঘটনা। আমাদের জীবনে আমরা বিভিন্ন প্রেক্ষিতে প্রায়শ এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। কিন্তু অতীত কখনোই সমগ্রতা নিয়ে হাজির হয় না। অতীত বিক্ষিপ্ত, তাই তার স্বভাব অস্পষ্ট, তাই তার প্রকাশ। ফারহানার ছবিতে তাই গাঢ় রঙের ওপর ছড়িয়ে থাকে কুয়াশার মতো হালকা রঙ। দূরে গহ্বরের মতো গাঢ় রঙের গভীরতা মাঝেমধ্যে তা আবার ভারী মেঘের মতো ঝুলে থাকে। তার ওপর আঁকিবুঁকি, ফুলের নকশা, তার পোশাক ব্যবসার ব্লকের ফুল আর বাটিকের রঙের টানাপড়েন তার স্মৃতির আড়াল ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যেন ক্যানভাস ছাপিয়ে উঠছে।
পেছন ফিরে তাকানো আর তা থেকে নিজেকে পুনর্নির্মাণ- এর মাঝে বাংলা কবিতার এক অসাধারণ প্রকাশ দেখি '৯০-এর অকাল প্রয়াত কবি শামীম কবীরের দীর্ঘ কবিতা 'মার সঙ্গে বাক্যালাপ'-এর। আত্মজৈবনিক কবিতাটি নির্মাণে, শৈলীতে বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন-
আর একবার ঘুরে পেছনে তাকাবো
কি তাকাবো না
ভেবে
সমস্ত ভাঙ্গা টুকরো গুছিয়ে কুড়িয়ে আবার
আমাকে জোড়া লাগালাম
কিন্তু হাত কই
তোমার বিপুল গড়নের মধ্যে
কোনখানে
এক টুকরো জটিল উল্লাস আছে
তার স্পর্শে বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণে
আর আমি
ভয়ে ভয়ে
মানুষ হয়ে
উঠে দাঁড়াই
কিন্তু পা কোথায়

শামীম কবীর আত্মজৈবনিক, কিন্তু নাজিব তারেক নিজেকে আড়াল করেন। তার কাজে মানুষ কই? মানুষের অনুপস্থিতিতে থেকে গেছে মানুষের পোশাক। তারেক বরাবরের মতো আঁকেননি। তবে তার চিরাচরিত রেখাও ত্যাগ করেননি। মানুষের অবয়বের 'অবয়ব' পোশাককে সেঁটে দিয়েছেন ক্যানভাসে। কখনও মনে হবে, এ পোশাক কি ফেলে দেওয়া পোশাক? পোশাকটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে ফ্রেমের ভেতর থেকে; বের হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু হাঙ্গারে সে ঝুলন্ত। কখনও পা বাড়িয়ে হেঁটে বের হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু ওপরের শরীরটি কই? অশরীরী এই পদক্ষেপ। মানুষ সম্পর্কে নাজিবের সাম্প্র্রতিক মনোভাব কী? নাজিব ফেসবুকে মাঝেমধ্যে নানা মন্তব্য ছুড়ে দেন। তাতে মানুষ-মানব এর বদলে মানবাকৃতি শব্দটি ব্যবহার করেন। মানুষ নিয়ে তার ভাবনায় সংশয় প্রকাশ পায়। শুধু হাত-পা থাকলেই মানুষ মানুষ হয় না। মানুষ তো আসলে আরও বড় কিছুর সম্ভাবনা বহন করে। তাই এই তির্যক শব্দবন্ধ 'মানাবকৃতি'- মানুষের মধ্যে যদি মানুষ না থাকে। শুধু অবয়বে সে মানুষ তাহলে কতটা উপস্থিত মানুষের ধারণায়? সেই অবয়ব বাদ দিলে থাকে শুধু পোশাক; সে তো এক ভুতুড়ে অন্ধকার। বিদ্রূপের আঁধার। আগাগোড়া কালো রঙের এই ফ্রেমগুলো বাইরে থেকে খুব অভিনব না হলেও ফ্রেমের ভেতরে পোশাকগুলোর বিন্যাসে নাজিব তারেককে মাঝেমধ্যে এক ঝলক চেনা যায়। তার রেখার আভাস পাওয়া যায়। ফারহানা ও তারেক হয়তো নিজেদের আঁকাআঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। এটা হয়তো তার শুরু; শেষ নয়।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]