সামাজিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে: অমর্ত্য সেন

১৯ জুলাই ২০১৭ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০১৭

অনলাইন ডেস্ক

অমত্য সেন- ফাইল ছবি


বিভিন্ন সামাজিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশ এখন ভারতের চেয়ে এগিয়ে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।


 


ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি।


 


সাম্প্রদায়িকতা তো বামপন্থী আদর্শের অন্যতম প্রধান শত্রু, কারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সে কেবল ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না, অত্যন্ত কুৎসিত, নিষ্ঠুর এবং হিংস্র ভেদাভেদ সৃষ্টি করে- এমন প্রশ্নে অমত্য সেন বলেন, এখানে বাংলাদেশের কথাটা খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। সেখানে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বিরাট লড়াই চলছে। যারা সেই লড়াই করছেন, তারা প্রচণ্ড সমস্যা এবং আক্রমণের শিকার হয়েও মাথা নত করেননি।


 


তিনি বলেন, সেখানকার (বাংলাদেশের) মানুষ যে এই লড়াইটা করতে পারছেন, তার কতকগুলো কারণ আছে। এক, দেশভাগের সময় একটা ব্যাপার হয়েছিল। বেশির ভাগ জমিদার হিন্দু ছিলেন, তারা পালিয়ে গেলেন, ফলে বিনা যুদ্ধে একটা ভূমি সংস্কার হয়ে গেল, যেটা আর্থিক ভেদাভেদ অনেকটা কমিয়ে দিল এবং তার ফলে সমবেত আন্দোলন গড়ে তোলা তুলনায় সহজ হল। দুই, বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলনে সমাজের নানা দিক থেকে বহু মানুষ একসঙ্গে যোগ দিলেন, এর ফলে পরবর্তী কালে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো নানা ক্ষেত্রে সামাজিক অগ্রগতি সহজ হল। বিশেষ করে মেয়েদের ভূমিকা অনেক জোরদার হতে পারল।


 


অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সাক্ষাৎকারে বলেন, বিভিন্ন সামাজিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশ এখন ভারতের চেয়ে এগিয়ে, এর পিছনে অনেকে মিলে কাজ করার এই ধারাটি খুব বড় ভূমিকা নিয়েছে এবং এটাই আবার বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে একজোট হতে সাহায্য করেছে।


 


তিনি বলেন, এ থেকে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া জরুরি এবং আমার ধারণা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে যে সংহতি গড়ে তুলতে পারি, সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি থেকে লোক থাকবেন।


 


আনন্দবাজারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সম্প্রতি আপনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা ঐতিহ্য আছে, ইদানীং এখানেও সাম্প্রদায়িকতার উপদ্রব ঘটছে কেন, খতিয়ে দেখা দরকার। এই প্রসঙ্গেই প্রশ্ন, সামগ্রিক ভাবে ভারতীয় সমাজেরও তো নিজস্ব কিছু শক্তি ছিল, জোরের জায়গা ছিল? আজ সেটা কেন এমন দুর্বল হয়ে গেল যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেশ জুড়ে এত প্রবল হয়ে উঠতে পারল? আমরা এই অবস্থায় এসে পৌঁছলাম কী করে?


 


এ প্রসঙ্গে অমত্য সেন বলেন, আমার ধারণা, এই সম্ভাবনাটা ভারতে চিরকালই ছিল। আমাদের দেশে জাতিভেদের কাঠামোটা খুব প্রাচীন। এখন, নীচের তলার মানুষের প্রতি উঁচু জাতের যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটার মধ্যে তো আইডেন্টিটি বা সত্তার একটা প্রশ্ন আছে। এবং সেটা রক্ষণশীল হিন্দু আইডেন্টিটি। এই সত্তাটাকে বাকি সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা বরাবরই ছিল।


 


তিনি বলেন, গাঁন্ধীজি একভাবে এই সমস্যাটার মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বলি, অরুন্ধতী রায় অম্বেডকরকে নিয়ে তার একটি লেখায় এ ব্যাপারে গাঁন্ধীর কঠোর সমালোচনা করেছেন। লেখাটি নানা দিক দিয়ে সুন্দর, কিন্তু অরুন্ধতীর গাঁন্ধী-নিন্দাটি বোধ হয় ন্যায্য নয়। আমি মনে করি গাঁন্ধী আসলে চেষ্টা করেছিলেন, কিছু কিছু ব্যাপারে উঁচু জাতের হিন্দুদের সঙ্গে আপস করে অন্য কিছু বিষয়ে সংস্কারে তাদের রাজি করাতে, যেমন জাতিভেদের তেজ কমানো, রিজার্ভেশন বা সংরক্ষণ চালু করা, এবং সর্বত্র ‘নিচু’ জাতের মানুষের প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আসলে গাঁধীর রাজনীতির জটিলতাটা বোঝা দরকার।


 


অমত্য সেন বলেন, কী করে আমরা এত দিন সাম্প্রদায়িকতার বিপদটাকে অনেক দূর ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছি, এখানে তার একটা উত্তর আছে বলে আমি মনে করি। কেবল গাঁন্ধী নন, আমরা কিছু ভাল নেতা পেয়েছি, যারা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, কিছু কিছু আপস করে, ওই বিপদটার মোকাবিলা করেছেন।


 


সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরেও বড়লোক এবং উঁচু জাতের হিন্দুদের মধ্যে একটা আঁতাতের সম্ভাবনা গোড়া থেকেই ছিল। এবং সেই আঁতাত থেকে অন্যদের সরিয়ে রাখার বা বিচ্ছিন্ন করার একটা আশঙ্কাও ছিল। রাজনৈতিক আদানপ্রদানের মাধ্যমে, কিছু কিছু আপস করে, সেটা অনেক দিন ঠেকিয়ে রাখা গিয়েছিল। কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রভাব বিস্তারের একটা তাগিদ বরাবরই ছিলই।


 


অর্থনীতিবিদ অমত্য সেন বলেন, এখন সেটাই অনেক বেশি উন্মুক্ত ও তেজী হয়েছে। হিন্দুত্বের রাজনীতিও মাথা চাড়া দিয়েছে এবং খোলাখুলি দেশবিজয়ের পর্যায়ে হাজির হয়েছে। উচ্চবর্ণের হিন্দু ছাড়া দেশের বাকি লোকেদের এতে ত্রাস বোধ করার সত্যিই কারণ আছে।


 


তিনি বলেন, এটা খুব দুঃখের কথা যে, আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু আমাদের মানতে হবে, আমরা এখানে পৌঁছেছি। এখন যে অবস্থা, সেটা তো মোটামুটি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের তলায় পড়ে যাওয়া বলতে পারি। এখন যদি বলা হয় যে, এখানে থাকলে চলবে না, ওপরে উঠে সমতল, উর্বর জমি চাষ করতে হবে, সেটা খুবই ভাল কথা, কিন্তু আগে এই ক্যানিয়ন থেকে বেরোতে হবে তো!




 

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)