সেই সব গানের গল্প

২৫ আগস্ট ২০১৭

কিছু গানের আবেদন যুগ যুগ ধরেও শেষ হয় না। সুরের চাদরে মোড়ানো সেসব গানের কথা আমাদের কাঁদায়-হাসায়। নিমজ্জিত করে ভাবনার সাগরে, মনের পর্দায় তৈরি করে কিছু দৃশ্যপট। বহু দিন পরও সঙ্গীতের সেই মূর্ছনা মনের পর্দায় তুলে আনে একই দৃশ্যপট। এভাবেই কিছু গান হয়ে ওঠে কালজয়ী

হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস

কণ্ঠশিল্পী :এন্ড্রু কিশোর
গীতিকার :সৈয়দ শামসুল হক
সুরকার :আলম খান

হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস
দম ফুরাইলেই ঠুস
তবু তো ভাই কারোরই নাই একটুখানি হুঁশ।
হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস
রঙিন ফানুস, হায়রে মানুষ\

পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া
সোনার পিনিশ বানাইছিলা যতন করিয়া
চেলচেলাইয়া চলে পিনিশ, ডুইবা গেলেই ভুস\

মাটির মানুষ থাকে সোনার মহল গড়িয়া
জ্বালাইয়াছে সোনার পিদিম তীর্থ হরিয়া
ঝলমলায়া জ্বলে পিদিম, নিইভ্যা গেলেই ফুস\

"আশির দশকের কথা। একদিন সুরকার আলম খানের বাসায় বসে আছি, এমন সময় সেখানে এলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। হাতে একটি কাগজ। তাতে লেখা ছিল 'হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস' গানের কথা। সেটি আলম ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'আলম সাহেব, গান তো লিখতে বলেছেন, কিন্তু গান তো আমি লিখি না। লিখতেও চাই না। কারণ, যা-ই লিখতে যাই তা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন আগেই লিখে ফেলেছেন! যদি নতুন কিছু না দিতে পারি, তাহলে তো লিখে লাভ নেই। শেষমেশ অনেক চিন্তা করে একটা ছোট্ট জিনিস লিখে এনেছি। জানি না, এটা আপনার কেমন লাগবে! তবে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কেউই এই শব্দগুলো তাদের গানে ব্যবহার করেননি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি গানটা পুরোপুরি শেষ করতে পারি, তাহলে এ গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার দিতে বাধ্য। কারণ, এ ধরনের গানের কথা আগে হয়নি। আপনি যদি আমার চাওয়ামতো সুর করতে পারেন, তাহলে আপনিও পুরস্কার পাবেন। আর আপনি যাকে দিয়ে গাওয়াবেন, তার ১০০ পার্সেন্ট লাগবে না, ৬০ পার্সেন্টও যদি গাইতে পারে, তাহলে সেও জাতীয় পুরস্কার পাবে- নিশ্চিত। হক ভাইয়ের এ কথা যে সত্য হয়ে ধরা দেবে- তা কল্পনাও করতে পারিনি। কিন্তু কখনও কখনও অকল্পনীয় ঘটনাও ঘটে। তার প্রমাণ, 'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস' গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া। এটি ছিল আমার শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শুনলে অবাক হবেন, 'বড় ভালো লোক ছিলো' ছবির এ গানের জন্য পুরস্কার পাওয়ায় যতটা না আনন্দিত হয়েছিলাম, তার চেয়ে বিস্ময়টা ছিল বেশি। বিস্ময়ের কারণ হক ভাইয়ের দূরদর্শিতা। একটা মানুষ কীভাবে অনুমান করতে পারেন, কোন কাজের ফল কেমন হবে? নিজেকে এ প্রশ্নই করেছি বহুবার। শেষে এটাই জেনেছি, সৈয়দ শামসুল হকের মতো সৃষ্টিশীল মানুষই পারেন ভবিষ্যৎ দেখতে।"
এন্ড্রু কিশোরের এ কথায় জানা গেল 'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস' গানটি নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের ভবিষ্যদ্বাণী কী ছিল। অবশ্য তার কথা অনুযায়ী এটাও মানতে হবে, সুরকার আলাম খানের গানের সুর-সঙ্গীত যেমন হওয়া চাই, ঠিক তেমনটাই হয়েছে। কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের কাছে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ করতে পেরেছেন বলেই পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু অবাক করা ঘটনা হলো, যে গান নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক আশার কথা শুনিয়েছিলেন, তার গীতিকথা লেখার বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রহই ছিল না তার। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব হলো? এর উত্তর পাওয়া গেল এন্ড্রু কিশোরের কাছেই। তিনি শোনালেন সে ইতিহাস। বললেন, 'বড় ভালো লোক ছিলো' নির্মিত হয়েছিল 'শাওন সাগর' প্রোডাকশন থেকে। এই প্রোডাকশনের বেশিরভাগ ছবিতে এক ধরনের বার্তা থাকত। নির্মাণেও ছিল নান্দনিকতার ছাপ। এই ছবিটিও নির্মিত হয়েছিল নান্দনিক কাজের চিন্তাধারা থেকেই। ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক মহিউদ্দিন। তিনি ছিলেন নামি এক প্রফেসর। 'শাওন সাগর' প্রোডাকশন তাকে দিয়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে। উদ্দেশ্য একটাই, শেষ বয়সে তিনি যেন পুরস্কার ও সম্মান পান। কারণ নান্দনিক চলচ্চিত্র কীভাবে নির্মাণ করতে হয়, তা প্রফেসর মহিউদ্দিন ভালোভাবেই জানতেন। তেমনি জানতেন ছবির গানেও কীভাবে ভিন্নতা তুলে ধরা যায়। যেজন্য গীতিকার হিসেবে সৈয়দ শামসুল হককে নির্বাচন করেছিলেন। হক ভাইও না না করে, শেষ পর্যন্ত এ ছবির জন্য গান লিখেছিলেন। লেখার পরই জানিয়েছিলেন, যদি প্রত্যাশামাফিক গানের সুর ও গায়কী তুলে ধরা যায়, তাহলে বড় কোনো স্বীকৃতি পাওয়া যাবে। তার সেই ধারণা সত্যি বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

ও আমার উড়াল পঙ্খী রে

কণ্ঠশিল্পী : সুবীর নন্দী
গীতিকার : হুমায়ূন আহমেদ
সুরকার :মকসুদ জামিল মিন্টু

ও আমার উড়াল পঙ্খী রে,
যা যা তুই উড়াল দিয়া যা
আমি থাকব মাটির ঘরে,
আমার চোক্ষে বৃষ্টি পড়ে
তোর হইবে মেঘের উপরে বাসা...

ও, আমার মনে বেজায় কষ্ট
সেই কষ্ট হইল পষ্ট
দুই চোক্ষে ভর করিল আঁধার নিরাশা।
তোর হইল মেঘের উপরে বাসা...

মেঘবতী মেঘকুমারী মেঘের উপরে থাক
সুখ দুঃখ দুই বইনেরে কোলের উপরে রাখ
মাঝে মইধ্যে কান্দন করা মাঝে মইধ্যে হাসা
মেঘবতী আজ নিয়াছে মেঘের উপরে বাসা।
'অয়োময়' নাটকে প্রথম হুমায়ূন আহমেদের লেখা গান গেয়েছিলেন সুবীর নন্দী। ওস্তাদ ওমর ফারুকের সুরে সুবীর নন্দীর গাওয়া সে গান শুনেই তার গায়কীর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। সে কারণেই নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন, তখন থেকেই চেয়েছেন প্লেব্যাকের জন্য সুবীর নন্দীর গান ছবিতে রাখতে। এ কথা অবশ্য অনেকেই জানেন। কিন্তু কোন গানের জন্ম কীভাবে হয়েছিল, তা আমাদের অনেকেরই আজানা। তাই 'ও আমার উড়াল পঙ্খী রে' গানের জন্মবৃত্তান্ত জানতে মুখোমুখি হয়েছিলাম সুবীর নন্দীর। তিনি শোনালেন এ গানের পেছনের কথা। বললেন, '২০০৩ সালের কথা। তখন হুমায়ূন আহমেদ 'চন্দ্রকথা' ছবির নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত। তিনি একদিন নুহাশ পল্লীতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। তখনও জানি না, কী কারণে তার এই আমন্ত্রণ। তবু গেলাম। তিনি শোনালেন তার নতুন ছবির গল্প। বললেন, ছবির সিকোয়েন্স দেখে একটা গান করতে হবে। গানের সুর করবে মিন্টু [মকসুদ জামিল মিন্টু]। সিকোয়েন্সে থাকবে- ফেরদৌস তার উড়াল মনের বাসনার কথা গানে গানে তুলে ধরবে। এর পর তিনি আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন তার লেখা গীতিকথা। 'ও আমার উড়াল পঙ্খী রে, যা যা তুই উড়াল দিয়া যা'- এমনই কথায় সাজানো ছিল গানটি। গানের বাণী পড়ে আমার কাছে অন্যান্য গানের কথা থেকে আলাদা মনে হয়েছিল। তার আগেও হুমায়ূন আহমেদের লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছি। সেগুলোয় তার নিজস্বতার ছাপ ছিল, কিন্তু এ গানের কথা ছিল একেবারে অন্য রকম। এর পর মকসুদ জামিল মিন্টু যখন গানের সুর শোনালেন, তখন আমি নিজেও অভিভূত। এর পর আর চুপচাপ বসে থাকা নয়। আমরা গানের রেকর্ডিং করার আয়োজন করলাম। অভিশ্রুতিতে গানটি রেকর্ড করা হলো। রেকর্ডিংয়ের দিন হুমায়ূন আহমেদ নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কাজের বিষয়ে তিনি অসম্ভব খুঁতখুঁতে। যে কাজ যেভাবে করতে চান, তা থেকে একবিন্দু এদিক-সেদিক হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু এ গান রেকর্ড হওয়ার পর তিনি একেবারে চুপচাপ। এতে ধারণা করা যায়, তার প্রত্যাশামাফিক কাজটি হয়েছিল। গানটি গেয়ে আমার মনটাও অন্য রকম এক ভালো লাগায় ছেয়ে গিয়েছিল। পরে এ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। এর চেয়েও বড় প্রাপ্তি ছিল, এই গান গেয়ে অসংখ্য শ্রোতার ভালোবাসা পাওয়া।

লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প

কণ্ঠশিল্পী :ফাহমিদা নবী
গীতিকার :এনামুল করিম নির্ঝর
সুরকার :দেবজ্যোতি মিশ্র

লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প
তারপর হাতছানি অল্প
চায় চায় উড়তে উড়তে
মন চায় উড়তে উড়তে।

টুপটাপ টুপটাপ বৃষ্টি।
চেয়ে থাকে অপলক দৃষ্টি
টুপটাপ টুপটাপ বৃষ্টি
চেয়ে থাকে অপলক দৃষ্টি
চায় চায় উড়তে উড়তে
মন চায় উড়তে উড়তে।

হাঁটি হাঁটি পা পা শুরু হয়
ভয় হয় শুধু ভয়, ভয় হয়
হাঁটি হাঁটি পা পা শুরু হয়
ভয় হয় শুধু ভয়, ভয় ভয়
চায় চায় উড়তে উড়তে
মন চায় উড়তে উড়তে

আশা আশা চারপাশে কুয়াশা
আয়নার কোলজুড়ে দুরাশা
চায় চায় উড়তে উড়তে।

"এখন যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলেই 'লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প' গানটা গাইতে হয়। শ্রোতাদের আবদার পূরণ না করলেই নয়। এই গান প্রকাশের পর কত যে অনুষ্ঠানে গেয়েছি, তার কোনো লেখাজোখা নেই। মজার বিষয় হলো, এত বছর ধরে গাইছি, তারপরও গানটা আমার কাছে পুরনো মনে হয় না। প্রতিবারই মনে হয়, যেন আনকোরা নতুন গান শোনাচ্ছি।"
ফাহমিদা নবীর মুখে এ কথা শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, দশক পেরিয়েও 'লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প' গানের আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। তাই ভক্ত-শ্রোতা বারবার তার কাছে এ গানের আবদার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। অনেকের মনে হয়, এটি ফাহমিদা নবীর গাওয়া শ্রেষ্ঠ গানের একটি। যে কারণে আমরাও খুঁজেছি এমন একটি গান সৃষ্টি হলো কীভাবে? সেই ইতিহাস শোনালেন গানের গীতিকার এনামুল করিম নির্ঝর। বললেন, 'এ গানের জন্ম একটু অদ্ভুতভাবে। সেটা এক দশক আগের কথা। আমি তখন 'আহা' ছবির নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত। প্রথম ছবি কেমন হবে, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার শেষ ছিল না। তাই কাজ করতে গিয়ে বারবার পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে। 'লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প' তেমনই পরিবর্তিত পরিকল্পনার ফল। ছবিতে শুধু অর্ণবের একটা গান রাখা হয়েছিল। কিন্তু কাহিনীর প্রয়োজনে পরে বেশ কিছু গান রাখা হয়েছে। ছবির রুবা চরিত্র উপস্থাপন করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, এই চরিত্রের মধ্যে এক ধরনের দুঃখবোধ আছে। সেটা স্পষ্ট করা জন্য একটা গান রাখা যেতে পারে। ভাবনা ছিল এটুকুই। তখনও কোনো গান লিখিনি। ছবির কাজে কলকাতায় গেলাম। পরিচয় হয় সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গে। কথা হয় সঙ্গীতের নানা বিষয় নিয়ে। এর পর সে রাতেই হুট করে লিখে ফেলি 'লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প' গানটি। রুবার একটা লুকোচুরি গল্প আছে, আছে মনের গহিনে দুঃখ। ঠিক সে কথাগুলো পঙ্ক্তির মতো করে লিখেছিলাম। গীতিকথা পড়ে দেবজ্যোতি গানের সুর করেন। নিজেই ডামি ভায়েস দেন। আমি চেয়েছিলাম, দেশের কোনো শিল্পীকে দিয়েই গানটি গাওয়াব। কিন্তু গানটি কে গাইবে, তখনও চূড়ান্ত হয়নি। দেশে ফিরে কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়। তারা আমাকে পরামর্শ দেন, গানটি ফাহমিদা নবীর কণ্ঠে মানাবে। ফাহমিদা নবীর গান শুনলেও তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। বলতে পারেন, এ গানের সুবাদেই ফাহমিদার সঙ্গে পরিচয়। যা হোক, ফাহমিদাকে দিয়ে গাওয়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হলো। আর্ট অব নয়েজ স্টুডিওতে গিয়ে গাইলেন ফাহমিদা। সঙ্গীত বংশপরম্পরায় তার রক্তে বইছে বলেই কি-না জানি না, ফাহমিদা তার গায়কী দিয়ে সেদিন আমাদের মুগ্ধ করলেন। কাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গানটি গাইতে হবে- এটা ভালোভাবেই জানতেন তিনি। কিন্তু রুবার মনের গহিনের বিষয়টি ফাহমিদা এত আবেগিভাবে ফুটিয়ে তুলবেন_ তা কল্পনাতেও ছিল না।'

কষ্ট পেতে ভালোবাসি

কণ্ঠশিল্পী :আইয়ুব বাচ্চু
গীতিকার :লতিফুল ইসলাম শিবলী
সুরকার :আইয়ুব বাচ্চু

কোনো সুখের ছোঁয়া পেতে নয়
নয় কোনো নতুন জীবনের খোঁজে
তোমার চোখে তাকিয়ে থাকা
আলোকিত হাসি নয়
আশা নয়, না বলা ভাষা নয়
আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি
তাই তোমার কাছে ছুটে আসি\

বুকের এক পাশে রেখেছি; জলহীন মরুভূমি,
ইচ্ছে হলে যখন তখন; অশ্রুফোঁটা দাও তুমি,
তুমি চাইলে আমি, দেবো অথৈ সাগর পাড়ি\

যখন আমার কষ্টগুলো; প্রজাপতির মতো ওড়ে,
বিষাদের সবক'টা ফুল; চুপচাপ ঝরে পড়ে,
আমার আকাশজুড়ে মেঘে, ভরে গেছে ভুল\

"গল্পটা খুব ছোট। নাটকীয় ঘটনাও নেই এতে। তারপরও এ গল্পের পটভূমিটা মনকে স্মৃতিকাতর করে রাখে। ভুলে যাওয়ার নয় ১৯৯৫ সালের প্রতিটি দিনের কথা। কেননা, সে বছর একের পর এক নতুন গান আর অ্যালবাম আয়োজনের নেশায় মত্ত ছিলাম। ব্যান্ড, একক এবং নিজের সঙ্গীতায়োজনের প্রথম মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশ করেছি একই বছরে। এ ছাড়াও অন্য সুরকারদের অ্যালবামে গেয়েছি, সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছি কয়েকজন শিল্পীর গানের। এর পাশাপাশি স্টেজ শো, টিভি আনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তো ছিলই। সব মিলিয়ে বছর গেছে বিরামহীন ব্যস্ততায়। যা হোক, এভাবে নিয়মিত কাজ করতে গিয়ে একদিন হঠাৎ মনে হলো, একটি ডাবল অ্যালবামসহ চারটি ব্যান্ড অ্যালবাম প্রকাশ করলাম, মিক্সডের সংখ্যাও বাড়ছে;তাহলে একক অ্যালবাম নয় কেন? সাত বছর কেটে গেছে, কোনো একক অ্যালবামের আয়োজন করিনি_ এ কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নিই, এবার একক অ্যালবাম করব। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই নতুন গানের সুর ও সঙ্গীতায়োজন শুরু করি। নিজেও লিখতে থাকি গানের কথা। তখন লতিফুল ইসলাম শিবলী এলআরবি এবং আমার বেশ কিছু অ্যালবামের জন্য গান লিখেছিলেন। 'কষ্ট' সেসব গানেরই একটি। খুব সহজ কথায় একজন প্রেমিকের বাসনার কথা তুলে ধরা হয়েছে এ গানে।"
আইয়ুব বাচ্চুর এ কথার রেশ ধরে গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, "আবেগি মনের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরা হয়েছে এ গানে। কিছু উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে কষ্টপিপাসুর এক প্রেমিক বাসনা। সহজ কথা, কিন্তু সেই কথাগুলোই লাখো শ্রোতার মনে আঁচড় কাটবে- তা স্বপ্নেও ভাবিনি। যখন অডিও আর্ট স্টুডিওতে গানটি রেকর্ডিং হয়, তখনও আমরা কেউ অনুমান করতে পারিনি, গানটি দেশজুড়ে আলোড়ন তুলবে। কিন্তু অনুমান ছাড়াও যে অনেক কিছু ঘটে যায়, তার প্রমাণ 'কষ্ট' অ্যালবামের সাফল্য। আইয়ুব বাচ্চু কতটা বড়মাপের শিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক, তার প্রমাণ পাওয়া যায় 'কষ্ট' অ্যালবামের প্রতিটি গানে। মজার বিষয় হলো, অনবদ্য সঙ্গীতায়োজন করেও আইয়ুব বাচ্চু অ্যালবাম প্রচ্ছদে নিজের নাম দেননি। সেখানে লেখা ছিল- সুর ও সঙ্গীত :রবিন।

এপিটাফ [যেদিন বন্ধু চলে যাব]

কণ্ঠশিল্পী :জেমস
কথা :মেছের মণ্ডল, লোকনাথ ও মারজুক রাসেল
সুর :জেমস

যেদিন বন্ধু চলে যাব,
চলে যাব বহুদূরে
ক্ষমা করে দিও আমায়,
ক্ষমা করে দিও।
মনে রেখো কেবল একজন ছিল,
ভালোবাসত শুধুই তোমাদের।

চোরা সুরের টানে রে বন্ধু
মনে যদি ওঠে গান,
গানে গানে রেখো মনে
ভুলে যেও অভিমান\

ভরা নদীর বাঁকে রে বন্ধু
ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোলে গান
চলে যেতে হবে ভেবে
কেঁদে ওঠে মন-প্রাণ\

'লেইস ফিতা লেইস' প্রকাশের কিছুদিন পর 'ঠিক আছে বন্ধু' অ্যালবামের কাজ শুরু করি। এটি ছিল আমার চতুর্থ একক। আগেরটা ব্যান্ড অ্যালবাম ছিল বলেই একক অ্যালবাম প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন গীতিকার আনন্দ, মারজুক রাসেলসহ কাছের কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আড্ডা হতো। হঠাৎ কিছু বিষয় মনকে নাড়া দিত। ভাবতাম, সে বিষয় নিয়ে গান করা যায় কি-না। 'পথ', 'হাউজি', 'সুলতানা বিবিয়ানা', 'বায়োস্কোপ'- এমন বেশ কিছু গানের থিম আড্ডা কিংবা কোনো ঘটনার মধ্য থেকেই পাওয়া। 'এফিটাফ' বা 'যেদিন বন্ধু চলে যাব'; যে শিরোনামই বলুন- এ গানের পরিকল্পনা মাথায় এসেছে আড্ডা থেকে। গানও লেখা হয়েছে তিনজন মিলে। এদের মধ্যে একজন গীতিকার মারজুক রাসেল। বাকি দু'জনের নাম মেছের মণ্ডল ও লোকনাথ। গান প্রকাশের পর অনেকে মেছের মণ্ডল, লোকনাথের পরিচয় জানতে চেয়েছেন। কিন্তু তখনও নীরব ছিলাম, এখনও আমি নীরব।'
জেমসের এ কথায় কিছুটা রহস্য থেকেই যায়। যদিও কেউ কেউ বলেন, মেছের মণ্ডল ও লোকনাথ হলো জেমস ও আনন্দের ছদ্মনাম। আসলেই ছদ্মনাম কি-না সে রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। রহস্য উন্মোচিত হোক বা না হোক, 'এপিটাফ' গানের সঙ্গে এর গীতিকারের নামও যে শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে, সে সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা, সাউন্ড গার্ডেন স্টুডিওতে রেকর্ড করা 'ঠিক আছে বন্ধু' অ্যালবামের 'এপিটাফ' গানের আবেদন এখনও ম্লান হয়নি। ১৯৯৯ সালে এ গান প্রকাশের পর থেকে এখনও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরছে। এখনও পথে-প্রান্তরে গানপাগল মানুষ যখন তখন গেয়ে ওঠেন- যেদিন বন্ধু চলে যাব, চলে যাব বহুদূরে...।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)