নিজেকে রক্ষা করেই যুদ্ধ শুরু সাজেদার

১৫ অক্টোবর ২০১৭

পুলক চ্যাটার্জী, বরিশাল ব্যুরো ও আবু জাফর সালেহ্‌, বরগুনা

শুরুটা হয়েছিল নিজেকে রক্ষার মধ্য দিয়ে। বিদ্যালয়ের গন্ডি না পেরোতেই রিকশাচালক বাবা সানু মিয়া মেয়ে সাজেদা আক্তারের বিয়ের কথাবার্তা শুরু করেন। ১৪ বছর বয়সে সাজেদার বড় বোন রানী বেগমের বিয়ে হয়েছিল। বোনের সংসার সুখের হয়নি জেনে নিজেই বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে বিয়ে প্রতিরোধ করেন। সেই তার শুরু নতুন যাত্রার।
বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের মাইঠা গ্রামের কিশোরী সাজেদা এখন বরগুনাসহ
গোটা দক্ষিণাঞ্চলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, যৌন নিপীড়ন ও মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করা এক সংগ্রামী মুখ। এ পর্যন্ত ১০৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ৮৭টি ঝরেপড়া শিশু স্কুলগামী হয়েছে তার মরিয়া চেষ্টায়। ১৪ জন মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন অজপাড়াগাঁর এ কিশোরী। সব কিছু যেন জাদুর মতো। প্রশ্ন হচ্ছে- দরিদ্র ঘরের এ মেয়েটির জাদুর কাঠির এত শক্তি কোথায় লুকিয়ে থাকে। শোনা যাক সাজেদার মুখেই।
প্রত্যয়ী সাজেদা জানান, আত্মবিশ্বাসই তার মূলশক্তি। বরগুনা সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত সাজেদা আক্তারের স্বপ্ন মাইঠা গ্রামকে বাল্যবিয়ে, শিশু নির্যাতন, উত্ত্যক্তকারী মুক্ত এবং যুববান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। যে গ্রামে সবাই তাদের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে। বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে আর কোনো কিশোরী অকালে মৃত্যুবরণ করবে না। দৃঢ়তার সঙ্গে তার উচ্চারণ- একদিন আমাদের এ দেশ অবশ্যই হবে সমৃদ্ধশালী।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় সাজেদার বড় বোন রানী বেগমকে ১৪ বছর বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেয় তার পরিবার। অল্প বয়সেই ভুগতে থাকে নানা রোগে। এরপর নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে রানীর জীবন। সংসারে নেমে আসে অশান্তি। মেয়ের এমন পরিণতির পরও সাজেদারও বাল্যবিয়ের আয়োজন হয়। এবার এর কুফল সল্ফপর্কে বাবা-মাকে বোঝাতে সক্ষম হয় সাজেদা। নিজেই নিজেকে বাল্যবিয়ের বিষ থেকে মুক্ত করে। নিজেকে রক্ষা করেই বিরত থাকেনি সংগ্রামী এ কিশোরী। ঝাঁপিয়ে পড়েন নিজ এলাকার বাল্যবিয়ে বন্ধ, মেয়েদের উত্ত্যক্তের প্রতিরোধ, ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলগামী করা, মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার মতো বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কাজে। তার এসব কর্মকান্ড এখন সর্বমহলে প্রশংসিত। সাজেদা এখন মাইঠা শিশু সংগঠনের সভাপতি। এ ছাড়া স্থানীয় সংগঠন সূর্যের আলো যুব ক্লাবের সাধারণ সল্ফপাদক। এ দুটি সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে সামাজিক নানা ব্যাধি দূর করতে এখন তার নিরন্তর যুদ্ধ।
সাজেদা আক্তারকে এ বছর 'ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস পিস প্রাইজ'-এর জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান মো. ফয়েজ কাওছার জানান, বাংলাদেশ থেকে সাজেদা আক্তারকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এ পুরস্কার শিশুদের নোবেল পুরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়। শিশু অধিকার রক্ষায় যেসব শিশু নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে লড়াই করছে, প্রতি বছর তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফ জাই এ পুরস্কার পেয়েছিল।
সামাজিক কর্মকান্ডের সম্মাননাস্বরূপ গত ২ অক্টোবর বরগুনা প্রেস ক্লাব এক দিনের জন্য সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয় সাজেদাকে। প্রতীকী এ দায়িত্ব পালনকালে সাজেদা জেলা প্রশাসন আয়োজিত জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবসের আলোচনা সভা, জেলা শিশু একাডেমির বিশ্ব শিশু দিবসেরর্ যালি এবং জেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া প্রেস ক্লাব সদস্যদের বিশেষ সভার সভাপতিত্বের দায়িত্বও তাকে পালন করতে হয়। অত্যন্ত আনন্দিত সাজেদা এ সময় অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন- 'আমি একজন কিশোরী হয়েও বরগুনা প্রেস ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। জেনেছি সাংবাদিকরা কীভাবে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সংকট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন। এ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আমি যেমন অনেক কিছু শিখেছি, তেমনি উৎসাহিতও হয়েছি। যা সারাদেশের মেয়ে শিশু ও কিশোরীদের উৎসাহিত করবে।'
বরগুনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, সব ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব তৈরি ও নারীর অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের বিকশিত করার লক্ষ্যেই বরগুনা প্রেস ক্লাব সাজেদাকে প্রতীকী সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়। সাজেদা যেন তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে আরও এগিয়ে যেতে পারেন সে ব্যাপারে বরগুনা প্রেস ক্লাব সার্বিক সহযোগিতা করবে।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ৫ অক্টোবর সাজেদা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগীয় ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। এ সময় সাজেদা বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুজ্জামানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বিভাগীয় কমিশনার সাজেদার কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাকে ৭ হাজার টাকার চেক দিয়ে অনুপ্রাণীত করেন তিনি।
বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী মুক্তা বলেন, 'এক বছর আগে আমার বাবা-মা আমাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় সাজেদাকে বিষয়টি জানাই। তার কাছে পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। এরপর সাজেদা আমাদের বাড়িতে গেলে আমার বাবা-মা ক্ষিপ্ত হন। পরে তাদের বাল্যবিয়ের কুফলগুলো জানানো হলে তারা বুঝতে পারেন। এরপর বন্ধ হয়ে যায় আমার বিয়ের আয়োজন। আমি সাজেদার কারণেই আজ লেখাপড়া চালিয়ে নিতে পারছি।'
বরগুনা জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মেহেরুন্নাহার মুন্নি বলেন, সাজেদা আক্তার যে বয়সে বাল্যবিয়ে, শিশু নির্যাতন এবং মাদকবিরোধীসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সাজেদাকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি সমাজের সবার প্রতি আহ্বান জানান।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)