সতী, স্রোতস্বিনী ও শঙ্কা

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

শেখ রোকন

আসামের ধুবরী জেলার মানকাচরে কামাখ্যা পীঠ

বরিশাল অঞ্চলের চমৎকার নদীটির নাম 'সুগন্ধা' কেন? কারণ এখানে সতী দেবীর নাসিকা পতিত হয়েছিল। সতী দেবীর নানা অঙ্গ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং তীর্থস্থান গড়ে ওঠার সঙ্গে স্রোতস্বিনীর আরও যোগ পাওয়া যায়। সেই সূত্রেই সতী দেবীর সঙ্গে যোগ রয়েছে কামাখ্যা দেবীরও।

কামাখ্যা দেবীর সঙ্গেও কি স্রোতস্বিনী বা নদীর কোনো সম্পর্ক রয়েছে? আমার যদিও জানা নেই; কাকতালীয়ভাবে জীবনে যে তিনটি কামাখ্যা মন্দির বা পীঠ দেখেছি, তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কোনো না কোনো নদী। প্রথমটি অবশ্যই কামাখ্যা দেবীর মূল মন্দির। প্রাচীন কামরূপ আর বর্তমান গৌহাটিতে এই তীর্থস্থানের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে বিপুল ব্রহ্মপুত্র। অবশ্য তারও অনেক আগে দেখেছিলাম ধুবরীর মানকাচরে অবস্থিত 'কামাখ্যা মন্দির'। সুদূর শৈশবে, কামরূপ-কামাখ্যা নিয়ে নানা ভীতিকর উপকথা শোনার কারণে গা ছমছম অনুভূতি নিয়ে। চত্বর থেকেই ফিরে এসেছিলাম; ভেতরে বিগ্রহ রয়েছে কি-না দেখা হয়নি। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে 'কালো নদী'। পরে জেনেছি, কামাখ্যা মন্দির একটাই। গারো পাহাড় এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক 'কামাখ্যা পীঠ'। সেগুলোতে চলে 'তান্ত্রিক সাধনা'। তৃতীয় পীঠটি দেখা হয়েছিল হঠাৎই, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও এলাকায়।

আগের কিস্তিতে লিখেছিলাম, ঘুমন্ত চেয়ারম্যানকে রেখে আমি ও অগ্রজ বেরিয়ে পড়েছিলাম। চেনা এলাকা নয়, কাছেপিঠে কোনো লোকজনও দেখা যাচ্ছে না। দিক ঠিক রাখার জন্য বরং নদীতীর ধরেই হাঁটতে থাকি। নিতাইয়ের পাড়ে পাড়ে ছড়ানো-ছিটানো বাড়িঘর, আম-কাঁঠালের ছায়াঘেরা। বাড়ির পাশের ক্ষেতে ফুটে আছে মৌরি ফুল।

বেশ কিছুদূর হাঁটার পর হঠাৎ একটি অপেক্ষাকৃত উঁচু ভিটা। বাড়িঘর নেই, গাছ-গাছালিতে ঘেরা। নদীর দিক থেকে হাঁটতে গিয়ে একটা পাকা ফটকের মতো স্থাপনা চোখে পড়েছিল কি? এতদিন পর আর মনে নেই। উঠে গেলে নদীর উল্টো দিকের প্রান্তে একটি বেড়াহীন ঘর চোখে পড়েছিল। তার পাশে ইতস্তত ছড়িয়ে কয়েকটি ভাঙা মাটির হাঁড়ি, পুরনো ছাই ও কাঠ কয়লা। বিস্ময় জেগেছিল চত্বরটির পরিচ্ছন্নতা দেখে। প্রায় ঢিবির মতো উঁচু ভিটাটি নিপুণ হাতে পরিষ্কার। চাপড়া-দূর্বাঘাস যেন কেউ মেশিন দিয়ে ছেঁটে রেখেছে।

তার চেয়েও বিস্ময়কর ছিল জনমানবহীনতা। আশপাশে কোথাও কেউ নেই। অদূরের নদী থেকে জলো হাওয়া আর ঘন গাছের ছায়ায় শান্ত, সৌম্য ও শীতল। দুপুরের রোদে হেঁটে হেঁটে আমরা খানিকটা ক্লান্ত; ঘাসের ওপর বসে চারপাশ দেখছি। হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলেন একজন। দুই হাতে লুঙ্গি হাঁটুর ওপর ধরে হন হন করে হেঁটে আসছেন চষা জমির মাঝখান দিয়ে। কাছে এলে দেখি বয়স চল্লিশের কোটায়, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। গায়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল দলের মলিন জার্সি, নম্বর ১০।

এসেই ভূমিকাহীন প্রশ্ন- এইহানে কী করেন?
উত্তরে অগ্রজ তার চেয়ারম্যান আত্মীয়ের উদ্ধৃতি দেন। শুনে যেন খানিকটা শান্ত। তারপর বলেন- এখানে বেশিক্ষণ থাইকেন না। চইলা যান।
- কেন? কোনো সমস্যা? আমরা বলি।
- জানেন না, এইডা কামাখ্যা মন্দির! এইসুম এইহানে কেউ আহে না।
- দুপুরবেলা কিসের ভয়? আমি ততক্ষণে রহস্যের গন্ধ পেয়ে গেছি। আর লোকটি একা; আমরা দু'জন।
- দুপুরে দেবীর চ্যালারা আইসা মন্দির সাফ করে।
- বলেন কি! চ্যালারা কই থাকে? কৌতুকের সুরে জানতে চাই।
- নেতাই গাঙো থাহে। সব গাঙ কামাখ্যা দেবীর।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানমনস্কতার মর্যাদা রক্ষায় আমরা দু'জনেই শব্দ করে হাসি। তাতে করে লোকটি যেন ক্ষেপে যায়। বলে- অক্ষন চইলা যান কইলাম। নাইলে খারাপ হইব। চ্যালারা আইল! টাইন্যা গাঙো চুবাইলে তহন ঠ্যালা বুঝবেন।

আমরা চত্বর থেকে চলে আসি। ভয় পেয়ে নয়, ঝামেলা এড়াতে। আসতে আসতে অগ্রজকে বলি, চোখ দুটো দেখছেন! কী লাল!
অগ্রজ মুচকি হেসে বলেন- দম দিয়ে আসছে ব্যাটা।

লেখক: সাংবাদিক ও নদী-গবেষক
[email protected]

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)